শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় আমরা অত্যন্ত দুঃখিত ও লজ্জিত। তবে এ দুঃখপ্রকাশ দেশে ঘটমান আর দশটা হামলা, হত্যা, লাঞ্ছনার মতোই। শুধু শিক্ষকদের ওপর ছাত্রদের হামলা হয়েছে বলে আলাদা করে দুঃখ প্রকাশের আর কিছু এখানে নেই। কারণ দুটো: একটা হলো এরকম ঘটনা এটাই প্রথম নয়। আর দ্বিতীয়টা হলো আজকাল ক্ষমতাবান শিক্ষকরাও আর ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধ্বে উঠে গুরুর আসনে বসার মতো চরিত্র খুইয়েছেন বা বিসর্জন দিয়েছেন।
শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যার সেদিন কিন্তু হামলার শিকার হননি হয়েছেন তার স্ত্রী। তিনিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আন্দোলনের নেতৃত্বাদানকারী। অথচ সবচেয়ে লজ্জিত, অপমানিক, ক্ষুব্ধ হয়েছে শ্রদ্ধেয় স্যার। অন্যদের মধ্যে এমন কোনো অনুভূতি আছে কি না জানি না। কারণ তারা স্যারের সঙ্গে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাননি। তবে হতে পারে, স্যার অত্যন্ত আবেগপ্রবণ, স্বপ্নবিলাসী এবং একই সঙ্গে অনুভূতিপ্রবণ বলেই ওমন করেছেন। স্বপ্নভঙ্গের কারণে অত্যধিক আবেগপ্রবণ হয়েই হয়তো তিনি ‘গলায় দড়ি দিতে’ চেয়েছেন।
অধ্যাপক জাফর ইকবাল লেখক এবং বক্তা হিসেবে বিশেষ করে তরুণ-কিশোরদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধার্হ ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তার ওপর তরুণদের অগাধ আস্থা। একারণেই তিনি যা করেন, বলেন, লেখেন সেটার দুর্দান্ত প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া হয়। সুতরাং তার ব্যক্তিত্ব যে সবসময় সার্চ লাইটের নিচে থাকে এটা বলাবাহুল্য।
এই অধ্যাপক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখক হিসেবে সেলিব্রেটি হওয়ার সাথে সাথে শিশু কিশোর তরুণদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার মহান দায়িত্ব কর্তব্যজ্ঞান করে কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এ নিয়ে বিস্তর লিখেছেন, অনুষ্ঠান করেছেন। নিজে যুদ্ধ করতে পারেননি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন।
তবে একাত্তর সালে শক্ত সামর্থ্য সত্ত্বেও কেন মুক্তিযুদ্ধে গেলেন না এ নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। অনেকে রসিকতা করে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা হওয়া বড়ই ভাগ্যের ব্যাপার। আল্লাই চাননি তাই তার সেই সৌভাগ্য হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ করতে না পারা সুবিধাবাদী বা ভীতুরাই আজকাল বেশি বেশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিলি করছেন এমন কথাও অনেক সমালোচক বলেন।
তবে যাই হোক আমরা মনে করি অধ্যাপক জাফর ইকবাল অত্যন্ত সৎ ও শ্রদ্ধেয় মানুষ। তিনি যা বলেন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বলেন। তবে বুদ্ধিজীবী হিসেবে গভীর উপলব্ধি সম্পন্ন মানুষ হতে হয়তো তার বাকি চুল ও গোঁফগুলো শুভ্রবর্ণ পেতে হবে!
ঠিক এই কারণেই তার কিছু স্ববিরোধিতা ও অতিউৎসাহী ব্যাপারটা হয়তো রয়ে গেছে। বর্তমানে সক্রিয় আর কয়েকজন চেতনা বিলাসীদের মতো জাফর ইকবালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বেশিরভাগ অংশজুড়ে থাকে ঘৃণা। তিনি আসলে চেতনার নামে ঘৃণা ফেরি করেন। কিন্তু বুঝতে পারেন না, কোমল হৃদয়ে প্রোথিত এই ঘৃণার বীজ ভয়ঙ্কর বিষবৃক্ষের জন্ম দেয়। তারা যতোটা না একাত্তরের নায়কদের কথা বলেন তারচেয়ে ঢের বেশি বলেন খলনায়কদের কাহিনী। এবং কখনো কখনো তা কল্পকাহিনীকেও ছাড়িয়ে যায়। মহান চেতনা ফেরি করতে এই অতিরঞ্জনকে তারা জায়েজ করে নিয়েছেন। অথচ আমাদের ওয়ার হিরোদের কাহিনীকেই যদি অতিরঞ্জিত করে নিতেন সেটা নতুনদের কাছে আরো শ্রদ্ধেয় হতো। শুধু তা-ই নয়, ঘাদানিকের মতোই নির্মুলের রাজনীতির দীক্ষা দিচ্ছেন এই অধ্যাপকরা।
এরপর আসি শিক্ষক আন্দোলনের কথায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন নব্য আওয়ামী লীগার এবং সঙ্গত কারণেই অতি আওয়ামী লীগার ভিসির বিরুদ্ধে শিক্ষকরা আন্দোলনে নামলেন তখন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক জাফর ইকবাল কলাম লিখলেন ‘এ লজ্জা কোথায় রাখি’। শিক্ষকরা ছাত্রদের পাঠদান ফেলে ব্যক্তিগত স্বার্থে আন্দোলন করে বেড়াচ্ছে এই লজ্জা তিনি ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৯৮ বর্গ কিলোমিটারের কোথাও রাখার জায়গা পেলেন না। সেই ভিসিকে অবশ্য শেষ পর্যন্ত গদি ছাড়তে হয়েছে। শিক্ষকরাও শ্রেণীকক্ষে ফিরেছেন।
কিন্তু যখন শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্ত্রীর নেতৃত্বে ভিসি বিরোধী আন্দোলন শুরু হলো তখন অধ্যাপক ইকবাল ভোল পাল্টালেন। তিনি সরাসরি যোগ দিলেন না কিন্তু সর্বান্তকরণে সমর্থন জানালেন। ওই ভিসি নাকি মিথ্য কথা বলেন এই যুক্তিতে তিনি এ যাবত তার সঙ্গে কোনো কাজ করেননি। স্ত্রীর সঙ্গে বেশ কয়েকবার গণপদত্যাগ নাটকও করেছেন। তাদের বিরোধের কারণে একাডেমিক কাউন্সিল হচ্ছে না। ফলে পরীক্ষাগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু অধ্যাপক নীরব!
সেদিন কাউন্সিল ঠেকাতেই জড়ো হয়েছিলেন শিক্ষকরা। এটা সামনে স্নাতক প্রথমবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি সভা ছিল। কিন্তু অধ্যাপক ইকবালের স্ত্রীর নেতৃত্বে তা ঠেকাতে গেলেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। সব ক্যাম্পাসে যা হয়, ভিসির পক্ষের ছাত্রলীগ ক্যাডাররা ঝাঁপিয়ে পড়লো তাদের ওপর। তার স্ত্রীকে নাকি ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। লজ্জায়, অপমানে, অভিমানে একাই বৃষ্টিতে ভিজেছেন তিনি। ক্ষোভে গলায় দড়ি দিতে চেয়েছেন।
অবশ্য তার যে আন্তরিকতা আছে সে ব্যাপারে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই একথা আগেই বলেছি। এই সব হামলাকারী ছাত্রলীগ ক্যাডারদের বিরুদ্ধে শাস্তি চাইবেন কি না এ প্রশ্নে শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক বলেছেন, কার বিরুদ্ধে শাস্তি চাইবো? ওরা তো আমারই ছাত্র!
এই শিক্ষক মানসিকতার জন্য আপনাকে আবারো শ্রদ্ধা, ড. জাফর ইকবাল। আপনার অসংখ্য স্ববিরোধিতা ও অবিমিশ্রকারিতার মধ্যেও শুধু এ কারণেই আবারো আপনাকে প্রণাম!

কোন মন্তব্য নেই