স্যার, আমরা তো আবেগে কান্দাইলচি

Share:
গত ৩০ আগস্ট উপাচার্য অধ্যাপক আমিনুল হক ভূইয়াকে প্রশাসনিক ভবনে ঢুকতে বাধা দেওয়ার সময় ভিসি বিরোধী শিক্ষকদের উপর ছাত্রলীগের হামলার পর ড. জাফর ইকবাল লজ্জায়, অপমানে, ক্ষোভে ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজ আমার জীবনে একটা নতুন অভিজ্ঞতা হলো। আজ যা দেখলাম, আমার জীবনে এ ধরনের ঘটনা দেখব তা আমি কখনও কল্পনা করিনি। কীভাবে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমার শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করতে পারল, আর আমাকে সেটা এখানে বসে বসে দেখতে হলো! যে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই স্লোগানের এতবড় অপমান আমি আমার জীবনে দেখিনি। এখানে যে ছাত্ররা শিক্ষকদের উপর হামলা চালিয়েছে, তারা আমার ছাত্র হয়ে থাকলে আমার গলায় দড়ি দিয়ে মরে যাওয়া উচিৎ। গলায় দড়ি দিয়ে না মরলেও তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় আমাকে ভুগতে হচ্ছে।’ উপাচার্যই এই ছাত্রলীগকে শিক্ষকদের ওপর ‘লেলিয়ে’ দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।


ওই দিনের হামলার ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, স্ত্রী পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হকের নেতৃত্বে শিক্ষকরা যখন ভিসির প্রবেশপথ আগলে ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়েছে তখন ছাত্রলীগের ছেলেরা ‘জয়বাংলা’ দিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ করে। শিক্ষকদের ব্যানার কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে, কারো কারো হাত দিয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। এই পুরো দৃশ্য দূরে বেদিতে বসে দেখছিলেন অধ্যাপক জাফর ইকবাল। ঘটনার পর তার স্ত্রীও অভিযোগ করেন, ছাত্রলীগ তাদের ওপর হামলা করেছে। আর এদের লেলিয়ে দিয়েছেন ভিসি স্বয়ং। গত সাত বছর ধরে তারাই যে এই ক্যাম্পাস চালাচ্ছেন, ভিসি উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন উত্তেজিত ভাষায় এ কথাও মনে করিয়ে দেন ড. ইয়াসমিন হক।

এরই জের ধরে সেদিন রাতেই ছাত্রলীগের সাত নেতাকর্মীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু পরদিন এর প্রতিক্রিয়ায় ড. জাফর ইকবাল বলেন, ‘শিক্ষকদের ওপর কে হামলা করেছে? ছাত্রলীগের ছেলেরা? না। এরা তো ছাত্র, আমাদের ছাত্র। এত কমবয়সী ছেলে, এরা কী বোঝে? ওদেরকে আপনি যা বোঝাবেন, তা-ই বুঝবে। কাজেই আমি যখন দেখলাম যে তিনজন আর চারজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে, এখন আমার লিটারালি (আক্ষরিক অর্থে) ওদের জন্য মায়া লাগছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এদের যারা বিপথগামী করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয় না। এই বাচ্চা ছেলেগুলোকে মিসগাইডেড করে পাঠিয়ে দিয়েছে, এখন তারাই বিপদে পড়েছে। ছাত্রত্ব বাতিল হবে, শাস্তি হবে। ওরা কী দোষ করেছে? কাজেই, এখন আমার খুবই খারাপ লাগছে। এই ছাত্রলীগের ছেলেদের শাস্তি দেওয়াটা এক ধরনের অন্যায়। যে তাদের পাঠিয়েছে, তাদেরকে শাস্তি দেন।’

এর এক দিন আগেই ‘ছাত্রলীগ থেকে আগাছা পরিষ্কার করা’র নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। সে প্রসঙ্গটি নিজেই টেনে এনে মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘এরা আমাদের ছাত্র। এদের আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। আমরা ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে, ওদের সঙ্গে কথা বলে, ওদেরকে ঠিক জায়গায় নিয়ে আসতে পারব। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আগাছাকে দূর করে দিতে। আমি বলি, না। আগাছাকে আমরা ফুলগাছে পরিণত করব। সম্ভব। আমাদের ছাত্র, আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। আমরা ওদেরকে ঠিক করে দেব।’

আহা! অত্যন্ত শিক্ষকসুলভ কথা!! এই অজন্মার কালে কোথাও এমন গুরু খুঁজে পাওয়া যাবে না। ছাত্রদের প্রতি কতোটা দরদ তিনি বুকে পুষে রেখেছেন। মনে পড়ে সেই শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চে তার তরুণদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা আর উচ্ছ্বাসভরা সেই ভাষণ। তিনি ক্ষমা চেয়েছিলেন কারণ তার কিছুদিন আগেই একটি লেখায় তরুণদের শুধু ‘ফেসবুকে লাইক’ দেওয়া দুর্বল মানসিকতার কারণে মৃদ্যু ভর্ৎসনা করেছিলেন বলে। আর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ৪২ বছর পর তরুণরা আরেক বাংলাদেশ এনে দিয়েছে বলে। ‘তোমরা আর কী কী করবে’ তারও একটা ফিরিস্তি ও গুরুসুলভ নছিহত করেছিলেন তিনি।

আহা! কী বাৎসল্য!!

এরপর বাচ্চাদের বিজ্ঞানমনস্ক, সৃষ্টিশীল মেধাসম্পন্ন করার নানা উদ্যোগের রূপরেখা দিয়ে তিনি বিভিন্ন সময় লিখেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি বিরোধী আন্দোলনের সময় শিক্ষকদের নিজেদের স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে ছেলেমেয়েদের পাঠদানে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে হালকা উপদেশও দিয়েছিলেন।

কিন্তু গোলটা বেঁধেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে। ভবন ও হলের নামকরণ নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রথম অশান্তি শুরু হয়। এরপরই আসে ভাস্কর্য নির্মাণ। এসবই বালসুলভ আবেগবশত করা হয়েছে বলে মনে হয়। এছাড়া এখানে সিলেটি ও ননসিলেটি আঞ্চলিকতার প্রভাবও রয়েছে। ড. জাফর ইকবালকে এসব বিতর্কের নেপথ্য নায়ক বলে মনে করে সিলেটের লোকজন। এ কারণে তারা যেমন তাকে সহ্য করে না, জাফর ইকবালও নানা সময় সিলেটবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন।

এরপরই আসে ভিসি বিরোধী আন্দোলন। জনপ্রিয় ভিসি সালেহ উদ্দিনকে জামায়াত-শিবির তোষণকারী আখ্যা দিয়ে বিদায় করা হয়। এসময় ছাত্রলীগ অবশ্য অগ্রনী ভূমিকা পালন করে। যদিও বর্তমান আন্দোলনকারী শিক্ষকরাই তাদের ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভিসি বিরোধী আন্দোলন তারপর থেকে চলছে। জানা যায়, এখানে একদল জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আছেন যারা ভিসি হওয়ার জন্য এক পায়ে খাড়া। কিন্তু সরকার বারবারই নিজের মতো ভিসি নিয়োগ দিয়েছে।

একই ধারাবাহিকতায় ড. মো. আমিনূল হক ভূঁইয়াকে নিয়োগ দেয়ার পরই দ্বন্দ্ব শুরু হয়। অধ্যাপক জাফর ইকবাল এর দুই মাস পর থেকেই তার সঙ্গে কোনো কাজ করেননি। কারণ তিনি ‘মিথ্যাবাদী’। এ বক্তব্য অবশ্য জাফর ইকবালের নিজের। ভিসির সাথে কোনো কাজ না করে কীভাবে বিভাগীয় কাজ সেরেছেন সেটা অবশ্য জানা যায় না। আর ছাত্রদের স্বার্থ সর্বাগ্রে থাকলে শিক্ষক হিসেবে তার এ অবস্থান কতো যৌক্তিক সেটাও বিচার্য।

বর্তমান ভিসিবিরোধী দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে গত ১৩ এপ্রিল। কক্ষ বরাদ্দ নিয়ে দুই শিক্ষকের সঙ্গে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক শিক্ষকের কথাকাটাকাটির পর। এখান থেকে ভিসিবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত। আন্দোলনকারীরা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত বলে ঘোষণা দেন। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষক ফোরামের ব্যানারে আন্দোলন চালিয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জন করেন। ক্লাস পরীক্ষা অনিয়মিত হয়ে যায়। তাদের নেতৃত্বে আছেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের স্ত্রী ড. ইয়াসমিন হক। জাফর ইকবাল এই আন্দোলনকে সর্বান্তকরণে সমর্থন জানালেও অজ্ঞাত কারণে সরাসরি অংশগ্রহণ করছেন না।

এখানে আরেকটি প্রশ্ন : ‘মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ শিক্ষক ফোরামকেই’ কেন তারা আন্দোলনের ব্যানার হিসেবে বেছে নিলেন। যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকারই এই ভিসিকে নিয়োগ দিয়েছে। এই চেতনার ধারক স্থানীয় সাংসদ এবং ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগও এই ভিসির পক্ষে। তাহলে জাফর ইকবালরা কি সরকারের সমান্তরাল অথচ স্বতন্ত্র চেতনার কথা বলছেন? এই সরকার তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিয়েছে, এ সংক্রান্ত একমাত্র তাদের বয়ানই গ্রহণযোগ্য হবে বলে হুকুম জারি করেছে। আর জাফর ইকবালও চেতনার যে বয়ান তৈরি করেছেন তার সঙ্গে সরকারের বয়ানের কোনো পার্থক্য নেই। তাহলে অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্রোতের মধ্যে থেকেই নিজেকে স্বতন্ত্র ও বিচ্ছিন্ন ভাবছেন কেন? এটা কি তার বালখিল্য!

এই ভিসির পদত্যাগ দাবিতে গত ২০ এপ্রিল জাফর ইকবাল ও তার স্ত্রীসহ ৩৫ জন শিক্ষক প্রশাসিনক বিভিন্ন পদ থেকে একযোগে পদত্যাগ করেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় ২৩ এপ্রিল জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডাকা হয়। স্ত্রীর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ভিসি দুই মাসের ছুটি নেন। তখন আন্দোলনকারীরা পদত্যাগপত্র না তুলেই কাজে যোগ দেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভিসি ড. মো. আমিনূল হক ভূঁইয়া নিজেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এবং সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট- এটা যে তারা বুঝতে পারছেন না এটা বিশ্বাস করাটাও কঠিন। ক্যাম্পাস অচল করে দিয়ে হয়তো দাবি আদায়ের চেষ্টা করছেন তারা। আর এর পেছনের উদ্দেশ্যটাও খুব স্পষ্ট। সেটা নতুন ভিসি নিয়োগ দিলেই আবার একই আন্দোলন যখন শুরু হবে তখন তা সবার সামনে উন্মুক্ত হয়ে যাবে। 

এর কারণ হলো- ভিসির বিরুদ্ধে এখনো শক্ত কোনো অভিযোগ দাঁড় করাতে পারেননি তারা যার কারণে পদত্যাগ বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। এর আগে ভিসির দুর্নীতি নিয়ে জুনের শেষ নাগাদ যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয় তাতে কিছু তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম ও ছোটখাটো আর্থিক দুর্নীতির উদাহরণ ছাড়া গুরুতর কিছু দেখাতে পারেননি তারা।

এরপর আসা যাক জাফর ইকবালের ‘বাচ্চা ছেলে’ প্রসঙ্গে। ছাত্রলীগের যারা হামলা করেছে তাদের ‘বাচ্চা ছেলে’ ‘কিছু বোঝে না’ বলে বাৎসল্য দেখিয়েছে তিনি, এটা তার বালখিল্যই মনে হয়। এই বাচ্চা ছেলেরা সহপাঠী বা নিজ সংগঠনের কর্মীকে যখন নৃশংসভাবে খুন করে, টেন্ডারবাজী, চাঁদাবাজী, ছিনতাইয়ের মতো জঘন্য কাজ করে তখন কি না বুঝে কারো কথায় সেসব করে? ভিসির প্ররোচনায় শিক্ষকদের উপর হামলা করার সময় জয়বাংলা স্লোগানটাও কি তাদের দিতে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল? জাফর ইকবাল ভুলে যাচ্ছেন যে, তারা ভিসিকে স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী প্রমাণে উঠেপড়ে লেগেছেন- এটাকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই হামলার সাথে এই স্লোগানটাও জরুরি ছিল।

জাফর ইকবাল স্যার, তরুণ, কিশোরদের শুধু বিমূর্ত উপদেশবাণী, স্বসংজ্ঞায়িত আদর্শ ইউটোপিয়া দেখানোকেই পথ দেখানো বলে না। তারচেয়ে বরং সুনির্দিষ্ট করে বলুন, আমরা কেমন ক্যাম্পাস চাই, কেমন প্রজন্ম চাই, কেমন দেশ চাই, কেমন সরকার চাই। শুধু চেতনাধারী প্রজন্ম বলে তকমাধারী গোষ্ঠী সৃষ্টি করা বিপজ্জনক। এতে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প চাপা পড়ে আছে, বেরিয়ে পড়ার পথ খুঁজছে। আপনারা আগে বরং চেতনাকে স্পষ্ট করুন। ঘৃণা ফেরি না করে প্রেম শিক্ষা দিন। আপনারা কি দেখছেন না, মানুষ যখন মঙ্গলগ্রহে বসতি স্থাপনের চেষ্টা করছে তখন ঢাকা শহরে রিকশার সংখ্যা বাড়ছে? ভালো অনুষ্ঠান কমছে কিন্তু টিভি চ্যানেল বাড়ছে? ছেলেমেয়েরা অদক্ষতার ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্যামিতিক হারে বাড়ছে? সবকিছুই ক্রমে অর্থহীন পরিসংখ্যানে পরিণত হচ্ছে?

কোন মন্তব্য নেই