আমি আপনার উদ্বেগের স্থানটি বুঝতে পেরেছি। অতি সম্প্রতি আস্তিক নাস্তিক ইস্যুতে বংলাদেশের রাজনীতিতে নতুনমাত্রা যোগ অনেককেই এই শব্দ দুটির ব্যাপারে অতিমাত্রায় সংবেদনশীল করে তুলেছে- তা বলা বাহুল্য। কিন্তু এতে খুব ভীত সন্ত্রস্ত হওয়ার কোনো কারণ আমি দেখছি না।
খুবই দুঃখের বিষয় এই সংবেদনশীলতার গভীরে কেউ যাচ্ছে না। ধর্মের ধ্বজাধারী আস্তিকরা যেমন আস্তিকতার অহমিকায় অন্ধ তেমনি সেকুলারিজমের ধ্বজাধারীরা প্রগতিশীলতার অহমিকায় উদ্ধত। চুম্বকের দুই বিপরীত মেরুর মতো এদের কখনোই এক টেবিলে বসানো সম্ভব হচ্ছে না।
এদের মুখোমুখি বসানো কেন সম্ভব হচ্ছে না তা নিয়েও কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। অথচ ইউরোপ আমেরিকার গণমাধ্যমগুলোতে এরা এক টেবিলে বসে অনএয়ারে কথা বলছে, তর্ক বিতর্ক করছে। মানুষ সেগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখছে, শুনছে, পড়ছে।
এখানে আপনি হয়ত তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধকে আমাদের চেয়ে উন্নতমানের এই জন্য সম্ভব হচ্ছে বলে দাবি করবেন। বলবেন, আমরা তাদের তুলনায় কয়েকশ বছর পিছিয়ে। কিন্তু এ জায়গাতে আমি আপনার সাথে দ্বিমত পোষণ করি। আমাদের এখানেও ওইরকম পরিস্থিতি কখনো ছিল না বা নেই এমনটি বলা যাবে না।
সংক্ষেপে বললে, এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বা দ্বান্দ্বিক অবস্থান নির্ভর করে শুধু সমালোচনার ভাষা ও আন্তরিকতার পার্থক্যের ওপর।
এখানে কিছু তালিকা দিলেই ব্যাপারটি বুঝতে পারবেন: বার্ট্রান্ড রাসেল, ফ্রেডারিক নিটশে, হান্টিংটন এবং বাংলাদেশে আহমেদ শরিফ, আরজ আলী মাতুব্বর, হুমায়ন আজাদ, তসলিমা নাসরিন এবং অতি সাম্প্রতিককালের কিছু ব্লগার নাস্তিকের বিরুদ্ধে ধর্মবিশ্বাসীরা খড়গ হস্ত।
অথচ মিশেল ফুকো, জ্যাক দেরিদা, অ্যাডওয়ার্ড সাইদ, নওয়াম চমস্কি, রবার্ট ফিস্ক, আইনস্টাইন, স্টিফেন হকিং এবং বাংলাদেশে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, আহমদ সফা, সলিমুল্লা খানরা মনেপ্রাণে নাস্তিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে কেউ রাস্তায় নামছে না।
এই দুই দল নাস্তিকের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও লক্ষ্যের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের অবস্থান একেবারে বিপরীত। তাহলে কোন বিষয়টা এতোবড় পার্থক্য করে দিচ্ছে?
বিষয়টি আহমদ সফাই তার একটি লেখায় পরিষ্কার করে দিয়েছেন। অর্থাৎ আপনি যখন ব্যক্তি বা সমষ্টির বিশ্বাস, মূল্যবোধের সমালোচনা করবেন সেখানে আপনার ভাষার প্রতি মনোযোগী হওয়াটা জরুরি। আপনি কীভাবে গৃহিত হবেন সেটা নির্ভর করবে সমালোচনার ভাষায় আপনার তাদের প্রতি কতোটা আন্তরিকতা প্রকাশ পাচ্ছে। আপনার ভাষা যদি হয় আক্রমণাত্মক এবং হাজার বছরের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা মূল্যবোধ আপনি রাতারাতি বদলে দেয়ার প্রয়াস চালান তাহলে খুব কঠিনভাবেই প্রত্যাখ্যাত হবেন।
সব মানুষই খেয়াল করে আপনার বক্তব্যে সে এবং তার বিশ্বাস কতোখানি গুরুত্ব পাচ্ছে। সমালোচনায় কতোটা দরদ আছে।
সমাজ খুবই স্থিতিস্থাপক একটি সংগঠন। আপনি যদি ঘুষি দিয়ে একে সোজা করতে চান তাহলে সমান প্রতিক্রিয়া পাবেন। হয়ত ছিটকেও যাবেন। কিন্তু পরিবর্তনটা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটতে দেন তাহলে দেখবেন সমাজ জানবেই না সে বদলে গেছে।
আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো আমরা মানুষের বিশ্বাস যে বিশ্বাস তার মূল্যবোধ গড়ে দিচ্ছে তার জীবনযাপন নিয়ন্ত্রণ করছে তাকে বুঝতে চেষ্টা না করে আমাদের মতো করে তাকে গড়ে নিতে চেয়েছি। বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন চলাকালীন শিল্প সাহিত্য দেখলেই বুঝা যায় সেখানে সবকিছুই কতোটা নগ্নভাবে আরোপিত। আর এ কারণেই মানুষ তাদের গ্রহণ করেনি।
অথচ দেখুন, সারা বিশ্বে সাইদ, চমস্কি, ফিস্করা আস্তিক নাস্তিক সবার কাছে কী তুমুল জনপ্রিয়। আমাদের দেশেও সফা, ইলিয়াসরা সবার কাছে আজও কতোটা গ্রহণীয়।
এদের সবার বিরুদ্ধে মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগ আছে। কিন্তু সত্যটা হলো- সাহিত্য, দর্শনের মাধ্যমে যদি কেউ মৌলবাদের উত্থানকে প্রশমিত করে থাকে তবে এই লোকগুলোই করেছেন।
আমরা কেন ধর্ম নিয়ে আলোচনা করবো না। আলোচনার মূল বিষয়বস্তুই তো হওয়া উচিৎ ধর্ম। কারণ সব সময়ই প্রগতির সামনে এসে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্ম। তখন কৌশলটা কী হওয়া উচিৎ সেটাও ওই সাইদ, চমস্কি, সফারা বলে দিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে ধর্মকে উপেক্ষা বা তাচ্ছিল্য নয় বরং ওই মতবাদকে আত্মীকরণের প্রক্রিয়া আবিষ্কার করাই সংস্কারকের কাজ। যেমনটি হয়েছে ভেনেজুয়েলায়, কিউবায়। সেখানে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে খ্রিশ্চিয়ানিটির মিশেলে পিপল অব গড নামে ধর্মের সমাজতান্ত্রিক বয়ান দাঁড় করা হয়েছে। এতে করে কি তাদের সেক্যুলারিটি মাঠে মারা গেছে? চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব তো আমাদের চোখের সামনে। আজকালকার নিম্নবর্গের ইতিহাস দর্শন সে কথাই বলছে।
ধর্ম যেমন মানুষের জন্য তেমনি যেকোনো মতবাদ দর্শন মানুষের জন্যই। সুতরাং মানুষের জন্যই একে ভাঙতে হবে, গড়তে হবে, পুনর্নির্মাণ করতে হবে। সবকিছুতেই মানুষই প্রধান্য পাবে।
সর্বোপরি, সব গণমাধ্যমে সব মতের মানুষের মতামত প্রকাশের জন্য একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম থাকে। এতে বিভিন্ন মতের মানুষের মধ্যে একটা অদৃশ্য যোগাযোগ তৈরি হয়। সেটা মুক্তমত, মতামত, কলাম, উপসম্পাদকীয় যে নামেই থাক না কেন। এখানে সব মানুষকে কথা বলতে দিতে হবে। যতোক্ষণ না সেটা আক্রণাত্মক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।
অন্তরে যথেষ্ট দরদ নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা যারা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমেছে এমন ঘটনা বিরল। আমাদের দেশে নাস্তিক ছিল আছে এবং থাকবে। তাদের সাথে আস্তিকদের সহাবস্থানও হবে শুধু যদি ভাষায় নমনীয় হওয়া যায়। সমালোচনায় দরদ থাকে। আপনি যদি আগেই কাউক শত্রু জ্ঞান করে সমালোচনা করতে নামেন তাহলে মাঠ উগ্রবাদীদের দখলে চলে যাবে।
আমাদের নাস্তিক ব্লগাররা সেই ভুলটিই করেছেন। তারা ধর্মান্ধ ও ধর্মভীরু মানুষদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার জন্য একটি পক্ষকে সুযোগ করে দিয়েছেন।
আমরা চাই আমাদের দেশে সেই ধরনের সমালোচনা শুরু হোক। সবাই এক টেবিলে বসে বিতর্ক করুক। এ দায়িত্বটা তাদেরই নিতে হবে যারা বুদ্ধিজীবী, অনেক জানেন। ধর্মভীরু মানুষের জানাশোনার পরিধি অনেক ছোট সুতরাং তাদের একটু করুণা দেখাতে তো সমস্যা নেই!
উগ্রবাদী আস্তিক, উগ্রবাদী নাস্তিক উভয়কেই আমরা পথ দেখাতে চাই। আলোচনা কেমন হওয়া উচিৎ এবং কীভাবে খুব সহজ ও নরম কথায় কতো কঠোর সমালোচনা করা যায়, নীরবে সমাজ পরিবর্তনের জ্বালানি সরবরাহ করা যায় তারা দেখুক শিখুক- আমরা এটাই চাই।

কোন মন্তব্য নেই