ঘুম ভেঙে বারান্দায় গিয়ে বসে ধুম্রশলাকায় আগুন জ্বালাবার সময়ও খেয়াল করিনি ঠিক পাশের বারান্দাতে সমান্তরালে বসে আছে পড়শীর নুবাইল কন্যাটি...
ধুম্রছায়া হাওয়ায় ভেসে তার ঘ্রাণগ্রন্থিতে আঘাত করলে আনমনাভাব কেটে যাবার পর সম্ভবত সে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়েছিল, ঠিক জানি না। উপস্থিতি টের পেলাম যখন শুনলাম কিছুটা বিরক্তিমাখা কন্ঠে কেউ বলছে;
- "ছিহ! আপনি সিগ্রেট খান?"
আমিও তাকে উত্তর দিতে চাইছিলাম,
- "সিগ্রেটই তো খাচ্ছি, কারো মাথাটাথা তো আর নয়।"
তবে সবকিছু তো আর বলা যায় না। অযথা আবেগও অনেক সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটায়। আমি সম্ভাব্য ঘাতকের তালিকায় নাম লেখাতে চাইছিলাম না বলেই হয়ত অজান্তে জবাব পাল্টালাম,
- "দুঃখিত, আপনাকে দেখি নি। আপনি তো দীপি, তাই না?"
দীপিতা উত্তর দিলেন,
- "নাহ, ওটা দীপিতা। মা-বাবা আদর করে দীপি ডাকেন। কিন্তু আপনার কান তো তুখোড়, নাকি দেয়ালেই কান পেতে রাখেন?"
যদিও আমি প্রায় কান পেতেই জানি এসব, তবু নিজের মান উর্ধমুখী রাখতে বললাম,
- "তেমন নয়, আসলে গেটের সামনে একদিন আংকেল আন্টি আপনাকে এই নামে ডাকছিলেন, তখন শুনেছিলাম। স্মৃতি ভাল আমার, মনেও আছে।"
তবে আসল সত্য হলো রাত বাড়লে যখন চারদিক নীরব হয়ে আসে, তখন আমার এই পাশাপাশি ফ্লাটে দীপিদের পারিবারিক কথোপকথন আবছা ভেসে আসে। তবে বিগত বছর তিনে দীপিতা নিশ্চয়ই মা-বাবার সাথে একসাথে নিচে নেমেছিল, আর সেটা অবশ্যই আমাদের ফ্লাটবাড়ির একমাত্র গেটখানা দিয়ে। এই সামান্য মিথ্যেটুকু তাই ভরসা করে বলাই যেত। এরমাঝে অবশ্য এতরাতে এভাবে একাকী কথা বলবার সুযোগ আবার কবে আসবে তা ভেবে কথা এগুবার ছুতো হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম আসমানের এই বান্ধবহীন নিম্নপ্রদেশে।
তবে এবার দীপিতাই কথা বাড়ালো!
- "আপনি প্রতিরাতেই এখানে এসে বসেন, না?" জিজ্ঞেস করলো।
আমি অবাক হয়ে উত্তর দিলাম,
- "হ্যা, এই শহরে হাঁটবারও জায়গা নেই, বারান্দাই ভরসা। তবে আপনি কি করে জানেন? খেয়াল করেন নাকি নজরে রাখেন?"
দীপি হাসলো, উত্তর না পেয়ে আবারও প্রশ্ন করলাম,
- "খেয়ালে না নজরে রাখেন?"
দীপিতা এবার কিছুটা বিব্রত, কি ভেবে যেন বলল,
- "আসলে দুটোই। আপনি যখন এসে বসেন, আমি আসি না। সেজন্যই যতটুকু..."
আমি আশাহত হলাম, বললাম,
- "তাহলে আমি ভেতরে যাই, আপনি বসেন।"
- "না না, তা কেন? আপনিও বসেন। অসুবিধা নেই, কথা বলতে ভালই তো লাগছে। শুধু সিগ্রেটটা এখন আর ধরাবেন না।" দীপিতা উত্তর দিল...
আমি হাসলাম, হাসতে হাসতেই নিজেকেই নিজে জানাচ্ছি এমন স্বরে উচ্চারণ করলাম,
- "শ্রেয়াস অন্ততঃ বারান্দাতে আর সিগ্রেট ধরাবে না।"
- "বাব্বাহ, এত দ্রুত পরিবর্তন? যাকগে, আপনার নামটাও জানা, এভাবে নিজে বলে জানাতে হবে না। পাশাপাশি দরজা, দরজাতেই লেখা আছে।" দীপিতাও হাসছিল।
আমি আসলে গলে যাওয়া চরিত্রে অভিনয় করছি ভেবে অমন ঢংয়ে বলেছিলাম, নাম জানাবার উদ্দেশ্য ছিল না। তবু বললাম;
- "আপনার বুদ্ধি ভাল।"
- "পড়ে দেখতে বেশি বুদ্ধি লাগে না। দেখতে ভাল সেটাও বলে ফেলুন।"
- "বলবার কিছু নেই, নাহলে সিগ্রেট ছাড়ি?"
- "ছেড়েই দিয়েছেন? ভেতরে গিয়েই তো ধরাবেন।"
- "সেটা তো আপনার আড়ালে, সামনাসামনি তো নয়।"
- "ফ্লার্ট করছেন?"
- "চেষ্টা করছি। মাত্রা না ছাড়ালে নিশ্চয়ই বকবেন না?"
- "সে দেখা যাবে। আমি অবশ্য যাকে তাকে এমনিতেও বকি না।"
- "দীপি, আমি শ্রেয়াস। যে সে ভেবে বসবেন না!"
- "এখনও ভাবছি না, তাই কথা বলছি। তবে আমি এখন উঠবো। আজ বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে।"
- "আজ বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে, মানে এরপরেও হতে পারে?"
- "হয়ত পারে! সে পরে দেখা যাবে..."
- "দেখা যাবে আর কি কথা হয়। তবে আমি আসলে যেন বারান্দায় আসা থেমে না থাকে।"
- "মনে থাকবে। আপনি বাঘভাল্লুক নন, আবার সিগ্রেটও ছেড়ে দিলেন, আসা তো যায়-ই। তবে এত সহজ ছেড়ে দেয়া, নাকি অভিনয় করছেন?"
- "তাই মনে হচ্ছে?"
- "সেটা জানা দরকার।"
- "জানতে হলে তো কথা বলা লাগে।"
- "তাহলে হবে।"
- "ঠিক আছে দীপি, আমি উঠি, নইলে আপনি ভেতরে যান।"
- "আপনি দুইবার দীপি বলে ডাকলেন। শুনতে খারাপ লাগছিল না।"
- "এতকিছু খেয়াল করছেন?"
- "আমি এমনই। ভেতরে যাই..."
- "আমিও যাই।"
- "আপনি কেন?"
- "বারান্দাটা এখন থেকে পুরোনো বারান্দা নেই, তাই?"
- "আচ্ছাহহহ?"
- "হা হা, যাই!"
- "হু, বাই!"
ভিতরে গিয়ে সিগ্রেট ধরালাম, অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিলো। দেয়াল পেরিয়ে এই ঘ্রাণ কি দীপিতার রুমে যাবে? সম্ভবত যাবে না। এখন সময় কয়টা? ঘড়ি আর মোবাইল দুটাই বলছে, রাত আড়াইটা। আগামিকাল তবে ঠিক দু'টায় বারান্দায় গিয়ে বসতে হবে। আমি জানি, দীপিতা কালও বারান্দায় বসবে। আমি আসবার আগেই কি? সম্ভবত না... কিংবা আসবার সাথে সাথে? হতে পারে... এরপর আবছা আলোয় চোখে চোখ পড়লে আমাদের কেউ না কেউ বলে উঠব, "কেমন আছেন?"
আমরা জানবো, আমরা ভাল আছি... অথবা কেউ ভাল নেই... বিরল অসুখে...
ফেসবুক থেকে ধারাবাহিক উপন্যাস। লেখক : এলবেক তেমুদ্দিন
- "ছিহ! আপনি সিগ্রেট খান?"
আমিও তাকে উত্তর দিতে চাইছিলাম,
- "সিগ্রেটই তো খাচ্ছি, কারো মাথাটাথা তো আর নয়।"
তবে সবকিছু তো আর বলা যায় না। অযথা আবেগও অনেক সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটায়। আমি সম্ভাব্য ঘাতকের তালিকায় নাম লেখাতে চাইছিলাম না বলেই হয়ত অজান্তে জবাব পাল্টালাম,
- "দুঃখিত, আপনাকে দেখি নি। আপনি তো দীপি, তাই না?"
দীপিতা উত্তর দিলেন,
- "নাহ, ওটা দীপিতা। মা-বাবা আদর করে দীপি ডাকেন। কিন্তু আপনার কান তো তুখোড়, নাকি দেয়ালেই কান পেতে রাখেন?"
যদিও আমি প্রায় কান পেতেই জানি এসব, তবু নিজের মান উর্ধমুখী রাখতে বললাম,
- "তেমন নয়, আসলে গেটের সামনে একদিন আংকেল আন্টি আপনাকে এই নামে ডাকছিলেন, তখন শুনেছিলাম। স্মৃতি ভাল আমার, মনেও আছে।"
তবে আসল সত্য হলো রাত বাড়লে যখন চারদিক নীরব হয়ে আসে, তখন আমার এই পাশাপাশি ফ্লাটে দীপিদের পারিবারিক কথোপকথন আবছা ভেসে আসে। তবে বিগত বছর তিনে দীপিতা নিশ্চয়ই মা-বাবার সাথে একসাথে নিচে নেমেছিল, আর সেটা অবশ্যই আমাদের ফ্লাটবাড়ির একমাত্র গেটখানা দিয়ে। এই সামান্য মিথ্যেটুকু তাই ভরসা করে বলাই যেত। এরমাঝে অবশ্য এতরাতে এভাবে একাকী কথা বলবার সুযোগ আবার কবে আসবে তা ভেবে কথা এগুবার ছুতো হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম আসমানের এই বান্ধবহীন নিম্নপ্রদেশে।
তবে এবার দীপিতাই কথা বাড়ালো!
- "আপনি প্রতিরাতেই এখানে এসে বসেন, না?" জিজ্ঞেস করলো।
আমি অবাক হয়ে উত্তর দিলাম,
- "হ্যা, এই শহরে হাঁটবারও জায়গা নেই, বারান্দাই ভরসা। তবে আপনি কি করে জানেন? খেয়াল করেন নাকি নজরে রাখেন?"
দীপি হাসলো, উত্তর না পেয়ে আবারও প্রশ্ন করলাম,
- "খেয়ালে না নজরে রাখেন?"
দীপিতা এবার কিছুটা বিব্রত, কি ভেবে যেন বলল,
- "আসলে দুটোই। আপনি যখন এসে বসেন, আমি আসি না। সেজন্যই যতটুকু..."
আমি আশাহত হলাম, বললাম,
- "তাহলে আমি ভেতরে যাই, আপনি বসেন।"
- "না না, তা কেন? আপনিও বসেন। অসুবিধা নেই, কথা বলতে ভালই তো লাগছে। শুধু সিগ্রেটটা এখন আর ধরাবেন না।" দীপিতা উত্তর দিল...
আমি হাসলাম, হাসতে হাসতেই নিজেকেই নিজে জানাচ্ছি এমন স্বরে উচ্চারণ করলাম,
- "শ্রেয়াস অন্ততঃ বারান্দাতে আর সিগ্রেট ধরাবে না।"
- "বাব্বাহ, এত দ্রুত পরিবর্তন? যাকগে, আপনার নামটাও জানা, এভাবে নিজে বলে জানাতে হবে না। পাশাপাশি দরজা, দরজাতেই লেখা আছে।" দীপিতাও হাসছিল।
আমি আসলে গলে যাওয়া চরিত্রে অভিনয় করছি ভেবে অমন ঢংয়ে বলেছিলাম, নাম জানাবার উদ্দেশ্য ছিল না। তবু বললাম;
- "আপনার বুদ্ধি ভাল।"
- "পড়ে দেখতে বেশি বুদ্ধি লাগে না। দেখতে ভাল সেটাও বলে ফেলুন।"
- "বলবার কিছু নেই, নাহলে সিগ্রেট ছাড়ি?"
- "ছেড়েই দিয়েছেন? ভেতরে গিয়েই তো ধরাবেন।"
- "সেটা তো আপনার আড়ালে, সামনাসামনি তো নয়।"
- "ফ্লার্ট করছেন?"
- "চেষ্টা করছি। মাত্রা না ছাড়ালে নিশ্চয়ই বকবেন না?"
- "সে দেখা যাবে। আমি অবশ্য যাকে তাকে এমনিতেও বকি না।"
- "দীপি, আমি শ্রেয়াস। যে সে ভেবে বসবেন না!"
- "এখনও ভাবছি না, তাই কথা বলছি। তবে আমি এখন উঠবো। আজ বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে।"
- "আজ বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে, মানে এরপরেও হতে পারে?"
- "হয়ত পারে! সে পরে দেখা যাবে..."
- "দেখা যাবে আর কি কথা হয়। তবে আমি আসলে যেন বারান্দায় আসা থেমে না থাকে।"
- "মনে থাকবে। আপনি বাঘভাল্লুক নন, আবার সিগ্রেটও ছেড়ে দিলেন, আসা তো যায়-ই। তবে এত সহজ ছেড়ে দেয়া, নাকি অভিনয় করছেন?"
- "তাই মনে হচ্ছে?"
- "সেটা জানা দরকার।"
- "জানতে হলে তো কথা বলা লাগে।"
- "তাহলে হবে।"
- "ঠিক আছে দীপি, আমি উঠি, নইলে আপনি ভেতরে যান।"
- "আপনি দুইবার দীপি বলে ডাকলেন। শুনতে খারাপ লাগছিল না।"
- "এতকিছু খেয়াল করছেন?"
- "আমি এমনই। ভেতরে যাই..."
- "আমিও যাই।"
- "আপনি কেন?"
- "বারান্দাটা এখন থেকে পুরোনো বারান্দা নেই, তাই?"
- "আচ্ছাহহহ?"
- "হা হা, যাই!"
- "হু, বাই!"
ভিতরে গিয়ে সিগ্রেট ধরালাম, অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিলো। দেয়াল পেরিয়ে এই ঘ্রাণ কি দীপিতার রুমে যাবে? সম্ভবত যাবে না। এখন সময় কয়টা? ঘড়ি আর মোবাইল দুটাই বলছে, রাত আড়াইটা। আগামিকাল তবে ঠিক দু'টায় বারান্দায় গিয়ে বসতে হবে। আমি জানি, দীপিতা কালও বারান্দায় বসবে। আমি আসবার আগেই কি? সম্ভবত না... কিংবা আসবার সাথে সাথে? হতে পারে... এরপর আবছা আলোয় চোখে চোখ পড়লে আমাদের কেউ না কেউ বলে উঠব, "কেমন আছেন?"
আমরা জানবো, আমরা ভাল আছি... অথবা কেউ ভাল নেই... বিরল অসুখে...
ফেসবুক থেকে ধারাবাহিক উপন্যাস। লেখক : এলবেক তেমুদ্দিন

কোন মন্তব্য নেই