এতোদিন নানা তর্ক-বিতর্ক দেখার পর অবেশেষে ডুব দেখে ফিরলাম। ফারুকির সেই আলোচিত ডুব। ইরফান খানের ডুব। আজকের দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম। কারণ ডুব না দেখে মন্তব্য করতে চাইনি।
সিনেমাটির সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ এর ডায়ালগ।
এরপর অভিনয়শিল্পীদের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো ক্যামেরার সামনে ফুটিয়ে তোলার অনন্য যোগ্যতা। যেহেতু বাঘা বাঘা অভিনয় শিল্পীদের নিয়ে এই সিনেমা, তাই এ যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তবে আলাদা করে বলতে হয় সাবেরির (তিশা) কথা। আনন্দ, বেদনা আর কান্নার অভিব্যক্তিতে তিশা নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন।
সিনেমায় প্রাণ দিয়েছে চিরকুটের 'আহা জীবন' গানটি। সিকোয়েন্স অনুযায়ী এর অস্থির ব্যবহার তিশার সাথে হলভর্তি দর্শককে কাঁদিয়েছে। একদম শেষে চিরচেনা 'পুরনো সেই দিনের কথা'র সুরের ব্যবহার যথার্থ ছিল। হল থেকে বের হওয়ার পরও এর রেশ কানে বাজছিল।
তাই ভেঙে যাওয়া একটি পরিবারের সম্পর্কের কাহিনী সহজ ভাষায় তুলে ধরার জন্য পরিচালক বাহবা পেতেই পারেন। কোলাহলের বিপরীতে নৈঃশব্দের শক্তির অর্থ খুঁজে পাবেন এই সিনেমায়। বাকহীন অভিব্যক্তিগুলো চোখে আরাম দেবে। ধন্যবাদ ফারুকি।
এবার একটু কটু কথা বলি! জাভেদ সাহেবের (ইরফান খান) অদ্ভুত উচ্চারণে বাংলা কথা কানে ঠেকছিল! সিনেমাজুড়ে ক্যামেরার অহেতুক নড়াচড়া চোখে অশান্তির কারণ হয়েছে। তবে জানি না এটা ক্যামেরা ব্যবহারের আধুনিক কোন ট্রেন্ড কিনা!
এবার আসি মূল বিষয়ে, সিনেমার কাহিনীতে। সেই চিরচেনা আর ছোট্ট 'প্রেম, বিয়ে, সন্তান, মেয়ের বান্ধবীর সাথে প্রেম, সংসার ভাঙা, আবার বিয়ে, খ্যাতির বিড়ম্বনা ও মৃত্যুর' পরিচিত কাহিনী। নন্দিত কথা সাহিত্যিকের জীবনের সংগে মিলে যাওয়ায় কাহিনী খুবই আপন মনে হবে। তবে পরিচিত কাহিনীতে সম্পর্কগুলোর সুক্ষ্ম মারপ্যাঁচে বিরক্ত হবেন না। ছোট্ট কাহিনীকে টেনে বড় করতে পরিচালক মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। বিরক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল না।
এবার আসি বিতর্কের বিষয়ে। পরিচালক শুরুতেই বলেছেন ' এ কাহিনী কাল্পনিক'। তবে কারও বুঝতে বাকি নেই এটা কার জীবনী! যেমন এই লেখায় আমি একবারও নন্দিত কথাসাহিত্যিকের নাম নেইনি, তবুও কারও বুঝতে বাকি নেই এখানে হুমায়ূন আহমেদের কথা বলা হয়েছে। ডুবের ক্ষেত্রেও তাই। পরিচালক চাইলেই এ বিতর্ক এড়িয়ে যেতে পারতেন। সিনেমায় জাভেদ সাহেব ও তার সাবেক স্ত্রীর পেশা দেখে মনে হয়েছে পরিচালক ইচ্ছাকৃত ভাবে নন্দিত কথাসাহিত্যিকের জীবনের সাথে এ কাহিনীর যোগসূত্র চেয়েছেন। ফারুকির নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে হুমায়ূন আহমেদের জীবন, প্রেমের জটিলতা, দ্বিতীয় বিয়ে আর মৃত্যু পরবর্তী নাটকীয় ঘটনাবলী একপাক্ষিক ভাবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান ছিল। তাই উল্লেখ না থাকলেও, নিতু (পার্ণো মিত্র) এ সিমেমায় নেতিবাচক চরিত্রের (ভিলেন) প্রতিনিধি!
তাই সিনেমাটি দেখার পর এর রিলিজ পূর্ববর্তী বিতর্ককে পরিচালকের ইচ্ছাকৃত অসততা বলে মনে হয়েছে। হতে পারে এটা ডুবের বাজার কাটতি বাড়ানোর একটা হীন কৌশল। যদিও এ ধরনের অসততা ফারুকির মতো বড় আর আন্তর্জাতিক মানের পরিচালকের কাছে কাম্য নয়।
সবশেষে, ডুব সবার জন্য নয়। নারী অভিনয়শিল্পীর অর্ন্তবাসের আভাস দেখে শিষ দেয়ার মানসিকতা নিয়ে হলে গেলে, আপনাকে হতাশ হতে হবে। এই সিনেমা ভালোবাসা আর সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাবে। ডুবের হাত ধরে বাংলা সিনেমা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নতুন মাত্রা পাবে, এটা নিশ্চিত। তাই ফেসবুকের তথাকথিত রিভিউ এড়িয়ে হলে গিয়ে ডুব দেখুন। বাংলা সিনেমার নবযাত্রায় অংশীদার হোন।
লেখক : অনিন্দ্য সাইমুম ইমন

কোন মন্তব্য নেই