লিবারেল ডেমোক্রেসির চেয়ে উন্নততর কোনো ব্যবস্থা আছে কি

Share:
ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা ও কার্ল মার্কস
ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা ও কার্ল মার্কস

Nondon Pothvola Galib খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। কয়েকটি কথা আপাতত বলে রাখি। ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার কথা ধরে নন্দন পথভোলা গালিবের প্রশ্নঃ “ব্যক্তি স্বাধীনতা আর সাম্য প্রতিষ্ঠিত হলেই (ফুকুইয়ামার মতে) যেহেতু অসাম্য এবং অবিচার থেকে সমাজ মুক্ত হবে, তাহলে লিবারেল ডেমোক্রেসির অধিকতর আর কি ইমপ্রুভমেন্ট আমরা আশা করছি?
মানে সরলীকরণ করে বললে, ব্যক্তি স্বাধীনতা আর সাম্য প্রতিষ্ঠা করলেই যদি সব ঝামেলা মিটে যায়, তাহলে লিবারেল ডেমোক্রেসির চেয়ে উন্নততর কোন সিস্টেম (হোক তা সমাজতন্ত্র কিংবা খেলাফত বা অন্য কোন কিছু) আছে কি না—তা আর খোঁজার দরকার আছে কি?”

১.
এই প্রশ্ন ‘গণতন্ত্র’ আর ‘সমাজতন্ত্রের পার্থক্য বিচারের প্রশ্ন। মার্কস ও লেনিনের চিন্তা সম্পর্কে ভুল ধারণা দেবার জন্য প্রশ্নটিকে তাদের বিরোধীরা এভাবেই বলে যে লিবেরেল ডেমক্রসি কায়েম থাকলে পুঁজিতন্ত্রের বিনাশ আর চাইতে হবে না, কিম্বা গণতন্ত্র কায়েম হবার পর একেই -- পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই ইতিহাসের শেষ পরিণতি হিসাবে আমাদের মেনে নিতে হবে; যেমন, ফুকুইয়ামার দাবি।

না, এটা নিছকই প্রপাগাণ্ডা। মার্কস, লেনিন এবং তাঁদের অনুসারীরা গণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং পুজিতান্ত্রিক বিকাশের গুরুত্ব সম্পর্কে বার বার বহুভাবে যেসব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন তাদের বিরোধীরা তাকে সবসময়ই নানা ভাবে আড়াল করবার চেষ্টা করে -- যাতে প্রচার করা যায় মার্কস লেনিন প্রমুখ গণতন্ত্র বিরোধী, এবং তারা খেয়ে না খেয়ে অনৈতিহাসিক ভাবে বা দেশকাল্পাত্র বিবেচনা না করে বুঝি সদাই পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছেন। মার্কসের চেয়ে জোরালো ভাবে কোন দার্শনিক পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার গতিশীলতা নিয়ে আজ অবধি অধিক কিছুই বলেন নি, বলতে পারেন নি। প্রমান? কমিউনিস্ট ইশতেহার। পড়ুন আবার। কিন্তু তারপরও মার্কস বলেছেন, পুঁজিতন্ত্র একটি স্ববিরোধী ব্যবস্থা, ফলে এটা শেষাবধি টিকবে না। তাহলে কেন মার্কস তা মনে করতেন বুঝতে হলে তার 'ক্যাপিটাল' বা পুঁজি বই অবশ্যই পড়তে হবে। 'সমাজতন্ত্রের অ আ ক খ' পড়ে বিপ্লব করা যায় না।

২.
গণতন্ত্রের বিকাশ ও চর্চা ব্যক্তির বিকাশের জন্যই জরুরী, যাতে ব্যক্তি সমাজের সামষ্টিক স্বার্থ আর তার নিজের স্বার্থের বিরোধ ও মিলের জায়গা সম্যক বুঝতে পারে। মানুষ স্বভাবে দাস নয়, ব্যক্তির মহিমা জ্ঞাপন ও উদযাপন প্রায়শই সংকীর্ণ ব্যক্তিতন্ত্রে খাবি খেলেও বুর্জোয়া গণতন্ত্র মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধি সঞ্চার করে যে মানুষ আদতে মুক্ত ও স্বাধীন । ফলে ডিক্রি জারি করে ব্যক্তির ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে এবং তার কামনা বাসনা দমন করে সমাজতন্ত্র কায়েম করা যায় না। যদি মানুষ আদতেই বুর্জোয়া বিপ্লবের মধ্য দিয়ে 'স্বাধীন' হয়, তার অর্থ ব্যক্তি সমাজের বাইরে বা সমাজের উর্ধে চলে যায় না, একই সঙ্গে 'সমাজ'কে ব্যক্তির জায়গা থেকে বুঝতে শেখে। সামাজিক হয়। তাহলে গণতন্ত্রে সমাজের গুরুত্ব ব্যক্তি অবশ্যই বুঝবে। যদি তাই হয় তাহলে ব্যক্তিতান্ত্রিক সংকীর্ণ স্বার্থ অতিক্রম করে সমষ্টির স্বার্থ রক্ষার মধ্য দিয়ে নিজের উন্নতি ও বিকাশের কথা মানুষ স্বাধীন ভাবে ভাবতে ও পরিকল্পনা করতে পারবে। সেই ক্ষেত্রে এক পর্যায়ে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের বিকাশের জন্যই বাধা হয়ে উঠবে এবং ব্যক্তি নিজের গরজেই তার বিরুদ্ধে লড়বে। গণতান্ত্রিক সমাজে সেই সংগ্রামের সাংস্কৃতিক, ও রাজনৈতিক বিকাশ ছাড়া গায়ের জোরে সমাজতন্ত্র কায়েম সম্ভব না।

এই সকল কারনে উৎপাদন শক্তির বিকাশ ছাড়াও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সম্পূর্ণ করে এবং গণতন্ত্র এবং পুঁজিতান্ত্রিক বিকাশের মধ্য দিয়েই সমাজতন্ত্রে পৌঁছাতে হবে, তারপর কমিউনিজম বা বিশ্ব সমাজ ব্যবস্থায়... ইত্যাদি। মার্কস এবং লেনিনের এটাই মূল দাবি। তবে একে অনেকে পর্যায়বাদ বলে সমালোচনা করেন। বাস্তব ইতিহাসকে সাক্ষী মেনে সেই তর্ক হতেই পারে।

৩.
ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্কের বিচার হেগেল তাঁর ‘অধিকার শাস্ত্রের দর্শন’-এ যেভাবে করেছেন, একালে তার পর্যালোচনা আমাদের চিন্তাকে অনেক পরিচ্ছন্ন করতে পারবে। তরুন মার্কস নিজেও সেই কাজ করেছেন। আমাদেরও করা উচিত যাতে পাশ্চাত্য চিন্তাকে আমরা আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে পর্যালোচনা করতে পারি।

৪.
গণতান্ত্রিক বিপ্লব মূলত রাজনৈতিক বিপ্লব। একে বুর্জোয়া বিপ্লব বলবার কারণ হচ্ছে এই বিপ্লবের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজা-বাদশাহী, জমিদারি বা জাতপাত, রক্ত, বর্ণ, গোত্র, গোষ্ঠি, বড়লোক-ছোটলোক ইত্যাদি সকল প্রকার বর্ণাশ্রমী, গোত্রবাদী, গোষ্ঠবাদী, সামন্তীয় বা অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষে মানুষে সমান এই ‘সাম্য’ সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রতিষ্ঠা। মানুষকে রাজা/প্রজা, জমিদার/ভুমিদাস, ব্রাহ্মণ/চণ্ডাল, বড়লোক/ছোটলোক এই প্রকার বিভাজনে নয় বরং সকলেই রাষ্ট্র ও আইনের চোখে ‘ব্যক্তি’, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও আইন সেটা যেন মানে, ব্যক্তিকে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের ভিত্তি গণ্য করে এবং বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ তা শক্ত ও নিরপেক্ষ ভাবে কার্যকর করে। এর ফলে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও আইনী সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এর জন্যই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বা সংক্ষেপে গণতান্ত্রিক বিপ্লব দরকার।

কিন্তু বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরেও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ধনি আর গরিবের অসাম্য থাকবে। শ্রমিক আর পুঁজিপতির দ্বন্দ্ব তীব্র হবে, সমাজে শোষণ নির্যাতন থাকবে, মুনাফা থাকবে... ইত্যাদি। সেসব দেখে যারা 'সামাজতন্ত্র' নিয়ে বকোয়াজগিরি করে কমিউনিস্ট ইশ্তেহারে তাদের 'প্রতিক্রিয়াশীল' বলে মার্কস ও এঙ্গেলস সমালোচনা করেছেন। সমাজতান্ত্রিকদের অধিকাংশই দেশকালপাত্র বিবেচনা করতে অক্ষম হবার কারণে প্রতিক্রিয়াশীল হয়। এটা অস্বাভাবিক কিছু না, শুধু মুশকিল হচ্ছে 'সমাজতন্ত্র' সম্পর্কে সমাজে বস্তা বস্তায় ভুল ধারণা ও আবর্জনা তৈরি হয়।

৫.
‘সাম্য’ বা ‘সাম্যবাদ’ কি? বাংলাদেশের কোটি টাকার পুঁজির মালিকের ভোট একটি, আর রাস্তার ফকিরেরও ভোট একটি – এই হোল ‘সাম্য’। ভোটের মালিক এবং দেশের নাগরিক হিসাবে তারা সমান, অথচ একজন বিশাল সম্পত্তির মালিক আর অন্য জন সর্বহারা। উভয়েই ব্যক্তি হিসাবে স্বাধীন এবং আধুনিক বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র উভয়ের সমান নাগরিক ও মানবিক অধিকার স্বীকার করে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব নাগরিক ও মানবিক অধিকার হিসাবে ব্যক্তিকে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আইনী ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে, কিন্তু সম্পত্তি বা অর্থনৈতিক অসাম্য মোচন করতে পারে না।

৬.
বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য হচ্ছে পুঁজির ‘দ্রুত এবং ত্বরান্বিত’ বিকাশ। কিন্তু মার্কস বা লেনিন তা চান কেন? কারণ এই রাজনৈতিক বিপ্লব না হলে বাংলাদেশের মতো দেশের অর্থনীতি মন্থর ও খোঁড়া অর্থনীতি হবে, ইউরোপ বা আমেরিকার মতো গতিশীল হবে না। পুঁজি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বিকশিত হলে সবচেয়ে বেশী কষ্ট পায় শ্রমিক, কৃষক মেহনতি শ্রেণি ও জনগণ। পোষাক শ্রমিকরা পুড়ে মরে, জ্যান্ত কবর হয়, মালয়েশিয়ায় সাপের কামড়ে বাংলাদেশের শ্রমিকেরা মারা যায়, সৌদি আরবে মরুভূমিতে মজুর হয়ে মরে, ইত্যাদি। এই বিষয়টি নিয়ে তর্ক আরও বিশদ ভাবে বোঝার জন্যই লেনিনের ‘সোশ্যাল ডেমক্রাসির দুই রণকৌশল’ পাঠ জরুরি বলেছি।

৭.
গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে মানুষ সামন্তীয়, জমিদারি, গোত্রবাদ, গোষ্ঠবাদ, জাতপাত, বড়লোক/ছোটলোকের পার্থক্য থেকে মুক্ত হলেও নতুন ধরণের গোলামির মধ্যে পড়ে। একেই বলা হয় পুঁজির গোলামি। অতএব সাম্য ও ব্যক্তির অধিকার কায়েম করলে সমস্যা মেটে না। নতুন বাস্তবতায় সমস্যা ভিন্ন একটি রূপ নেয়। যেমন, পুঁজির সঙ্গে শ্রমের দ্বন্দ্ব। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরে হাজির হওয়া এই দ্বন্দ্বের মীমাংসাই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব।

পুঁজিতান্ত্রিক কিন্তু বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব ক্রমে ক্রমে তীব্র হয় এবং পুঁজি ও মজুরি শ্রমের দ্বন্দ্ব উপলব্ধি করবার শর্ত তৈরি হয়, মানুষ ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক নতুন ভাবে নির্ণয়ের চেষ্টা চালায় – অর্থাৎ পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক উৎখাত এবং তার ওপর গড়ে ওঠা আধুনিক রাষ্ট্রের বিলয় ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে সক্ষম হয়। মানুষ বুঝতে পারে সে ব্যক্তি হলেও সমাজের বা বিশ্বের বাইরে নয়। বিশ্বব্যাপী উৎপাদন হচ্ছে সামাজিক ভাবে, অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ ও দেশের মানুষ নানান ভাবে পরস্পরের সঙ্গে উৎপাদনে যুক্ত, অথচ উৎপাদনের উপায় বা হাতিয়ার থাকছে ব্যক্তি মালিকানার অধীন। তখন উৎপাদনের উপায়ের সামাজিকীকরণ একটি স্বাভাবিক এবং অনিবার্য দাবি হিসাবেই উঠবে। উঠবেই।

৮.
মানুষ সমাজের বাইরে কোন আজগবি সত্তা নয়, সমাজেই মানুষের বন্ধন কিম্বা মুক্তি। অন্যদিকে ‘সমাজ’ বা ‘মানুষ’ বিমূর্ত কোন সত্তা নয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক – বৈষয়িক জীবন উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের এবং প্রকৃতির সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক গড়ে ওঠে; সেই সকল সম্পর্কের পরিণতি বা ফল হচ্ছে মানুষ। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের আগে 'মানুষ'-এর ধারণা এবং আধুনিক বুর্জোয়া সমাজে 'মানুষ' সংক্রান্ত অনুমান এক নয়। চিরায়ত মানুষের ধারণার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা 'মানবতাবাদ' দিয়ে সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম ব্যাখ্যা করা ইতিহাস বোঝার অক্ষমতা এবং সাধারণত পেটিবুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাচেতনার ফল। এর সঙ্গে মার্কস এবং লেনিনের কোন যোগ নাই।

৯.
গণতান্ত্রিক বিপ্লব ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করে 'দ্রুত ও ত্বরান্বিত' পুঁজিতান্ত্রিক বিকাশ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় প্রযোজ্য, এটা আমরা -- রুশ বিপ্লবের একশ বছর পরেও দাবি করতে পারি। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলে অতীতের ভুলত্রুটি পরিহার করা বাংলাদেশের পক্ষে এখন অনেক সহজ।

লেখক : ফরহাদ মজহার

কোন মন্তব্য নেই