সংবাদের নিরপেক্ষতা বলতে কী বোঝায়

Share:

বস্তুনিষ্ঠ, পক্ষপাতহীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য রিপোর্টিং নিরপেক্ষতার মূল ভিত্তি। নিরপেক্ষতা দাবি করে যে, আপনি সব মতামত যাচাই করবেন, হয়তো যেগুলোর কোন বাস্তব ভিত্তি নেই বা তথ্য-প্রমাণের বিপক্ষে যায় সেগুলো বাদ দেবেন। নিরপেক্ষতার মানে বিভিন্ন ধরণের মতামত তুলে ধরা।

সাংবাদিকতার মূল স্তম্ভ হচ্ছে নিরপেক্ষতা। সব সাংবাদিকতা নিরপেক্ষ নয় – সব সাংবাদিকতা নিরপেক্ষ হবার প্রয়োজন নেই। অনেক ভাল সাংবাদিকতা দেখা যায় এমন সব সংবাদপত্রে যাদের নিজস্ব মতাদর্শ আছে । পাঠকরা সিদ্ধান্ত নেবেন তারা সেই পত্রিকা কিনবেন কি না, নাকি অন্য কোন পত্রিকা কিনবেন যেটাতে তাদের মতামতের প্রতিফলন হয় – অথবা উল্টোটা হয়।

নিরপেক্ষতা নিয়ে অনেক ভুল বোঝা-বুঝি আছে, বিশেষ করে তাদের মাঝে যারা মনে করেন নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা একটি কাল্পনিক ব্যাপার মাত্র।

অনেকে মনে করেন, বস্তুনিষ্ঠতা, পক্ষপাতহীনতা, ভারসাম্য এবং ন্যায্যতা-র মত পরিভাষা আর নিরপেক্ষতার মানে এক। এগুলো একে অপরের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তারা একই জিনিস নয়। এই পার্থক্য দেখানোর একটি পথ হচ্ছে একটি স্টোরি যা বিবিসি সংবাদদাতা এ্যালান লিটল ব্যবহার করেন:

আপনি একটি ক্যাফেতে ঢুকলেন যেখানে দুজন লোক তর্ক করছে। একজন বলছে, ‘দুই আর দুই-এ চার হয়’। অন্যজন দ্বিমত পোষণ করে বলছে, ‘দুই আর দুই-এ পাঁচ হয়’।

আপনি যদি এই তর্কের গল্প আপনার বন্ধুর কাছে বলেন, সেটা আপনি বস্তুনিষ্ঠ, পক্ষপাতহীন, ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায্য এবং নিরপেক্ষ ভাবে বলতে পারেন – এবং প্রতিটি রিপোর্ট ভিন্ন হবে।

বস্তুনিষ্ঠতার মানে হবে অংক বা সংখ্যাগুলো নিয়ে কোন মত প্রকাশ না করে দুই লোক কী বলছিলেন সেটাই রিপোর্ট করা। আপনি বলতে পারবেন না কার যুক্তি সঠিক বা কারটা বেঠিক। উত্তরটা আপনি জানেন না, সে কারণে নয়, কিন্তু সেই বিচার করার জন্য আপনার কোন  পদ্ধতি নেই।

পক্ষপাতহীনতার মানে হবে দু’জন কী বলছে সেটা কোন যাচাই-বাছাই ছাড়া রিপোর্ট করা, যদিও আপনি জানেন এদের একজন ভুল।

ভারসাম্য বজায় রাখা মানে হবে, দুজনের কথার সত্যতা নির্ধারণ না করেই সমান ভাবে রিপোর্ট করা।

ন্যায্যতা মানে হবে দুজনের দাবিই যত ন্যায্য ভাবে সম্ভব রিপোর্ট করা – মোটামুটি যেভাবে দুজন নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করার জন্য যুক্তি দিয়েছে সেভাবে। কিন্তু আবার, সত্য নির্ধারণ না করে।

নিরপেক্ষতার মানে হবে, দুজনের কথা যত দূর সম্ভব সঠিকভাবে রিপোর্ট করা এবং একই সাথে অন্যান্য প্রাসঙ্গিক মতামত নিয়ে আসা, যেমন কোন গণিতশাস্ত্র বিশারদ যিনি বলবেন একজন সঠিক আর অন্যজন ভুল ।

নিরপেক্ষতা আপনাকে সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি সিদ্ধান্তে আসতে দেয়, এবং অন্যান্য উল্লেখযোগ্য, প্রাসঙ্গিক মতামত নিয়ে আসার শর্ত সৃষ্টি করে। নিরপেক্ষতা আরো দাবি করে যে, আপনি সব মতামত যাচাই করবেন, হয়তো যেগুলোর কোন বাস্তব ভিত্তি নেই বা তথ্য-প্রমাণের বিপক্ষে যায় সেগুলো বাদ দেবেন। নিরপেক্ষতার মানে বিভিন্ন ধরণের মতামত তুলে ধরা।

যথাযথ নিরপেক্ষতা

আপনি যদিও আপনার সকল সাংবাদিকতায় নিরপেক্ষ হবার চেষ্টা করবেন, কিন্তু কিছু কিছু ইস্যু আছে যেখানে নিরপেক্ষতা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং যেখানে আপনাকে আরো বেশি পরিসরে ভিন্ন মতামত সংগ্রহ এবং তা যাচাই করতে সচেষ্ট হতে হবে।

যে কোন বিতর্কিত বিষয়কে যথাযথ নিরপেক্ষতার সাথে দেখতে হবে।

একটি বিতর্কিত বিষয় হতে পারে এমন একটি ইস্যু যেটা নিয়ে সমাজে মতামতের প্রচণ্ড বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে; অথবা যেটা নিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি রাজনীতিকরা একে অপরের সাথে কঠোর ভাবে  দ্বিমত পোষণ করছেন; যেখানে কোন নির্দিষ্ট বিতর্ক সরকারের নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে বা কোন ধরনের কঠোর পদক্ষেপ আসতে পারে।

অবশ্য, বিতর্কিত বিষয়ের কোন চূড়ান্ত তালিকা নেই – কোন্ বিষয় বিতর্কিত আর কোনটি নয়, সেটা নির্ধারণ করার জন্য আপনাকে নিজের সম্পাদকীয় বিচার-বিবেচনা প্রয়োগ করতে হবে। তবে সাধারণ বিচারে বলা যেতে পারে, খবরে থাকা যে কোন বিষয় বিতর্কিত হবার সম্ভাবনা বেশি।

যথাযথ নিরপেক্ষতার মানে এই না যে চূড়ান্ত কনটেন্ট – প্রচারিত প্রতিবেদন বা ওয়েব পেজ – শুধুমাত্র পক্ষপাতহীন এবং ভারসাম্যপূর্ণ হবে। কিন্তু তার মানে হচ্ছে আপনার উচিত নির্দিষ্ট বিষয়ে সকল উল্লেখযোগ্য মতামত এবং চিন্তাধারার অনুসন্ধান করা।

আপনি তখন তথ্য-ভিত্তিক সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন – আপনার প্রতিবেদনকে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিতে গুছিয়ে বা উপযুক্ত বা উপসংহার টেনে। কিন্তু তথ্য সংগ্রহ, প্রতিবেদনের গঠন এবং আপনার নিজস্ব বর্ণনা সব কিছু নিরপেক্ষ ভাবে করতে হবে।

সময়ের ব্যবধানে নিরপেক্ষতা

কোন জটিল বিষয়ে নিরপেক্ষতা এক রিপোর্ট বা অনুষ্ঠানে না হলেও সময় ধরে অর্জন করতে হবে।

যে কোন আইটেম – বিশেষ করে বুলেটিনের নিউজ আইটেম – ন্যায্য হতে হবে। কিন্তু প্রায়ই, বিশেষ করে, ব্রেকিং স্টোরি বা যে ঘটনা ক্রমাগত গড়াতে থাকে সেগুলোর ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা অর্জন করতে কিছু সময় লেগে যেতে পারে।

আপনার রিপোর্টিং নিরপেক্ষ করতে যে পরিসরে মতামত সংগ্রহ করা প্রয়োজন সেটা করতে বেশ কিছু সময় লেগে যেতে পারে।

যেমন, কোন ঘটনার সাথে জড়িত একটি পক্ষ যদি কোন মতামত দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে সেটার জন্য স্টোরিকে আটকে দেয়া যাবে না। ব্রেকিং স্টোরি বা নিউজ এ্যালার্টে যা কিছু জানা গেছে সেগুলোই থাকবে – বিশ্লেষণ, আলোচনা, বিতর্ক পরে আসতে পারে। একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের বিতর্কে কোন গুরুত্বপূর্ণ আলোচককে অংশ নিতে সম্মত করতে সময় লেগে যেতে পারে। অথবা, ঘটনা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা বদলে যেতে পারে এবং ভিন্ন ধরণের মতামতের প্রয়োজন হয়ে পড়তে পারে।

কিছু সময়ের মধ্যে সকল উল্লেখযোগ্য এবং প্রাসঙ্গিক মতামত প্রচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের সম্পাদকের। এর মানে হচ্ছে, বিভিন্ন মতামতের  তুলনামূলক গুরুত্ব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া, যাতে সংখ্যালঘু মতামতকে সংখ্যাগুরু মতামত হিসেবে অনুষ্ঠানে না প্রচার করা হয়।

সম্পাদকের আরো দায়িত্ব  হচ্ছে নিরপেক্ষতা নিয়ে দীর্ঘ-মেয়াদী সমস্যাগুলো যাতে না হয় সেটা নিশ্চিত করা:

‘ভিকটিম কালচারকে’ সমর্থন করা। পৃথিবী সুন্দর ভাবে অপরাধী এবং ভিকটিম বা অপরাধের শিকার, এই দুই ধারায় বিভক্ত না। ঘটনার গভীরে গিয়ে জানতে হবে আসলেই কী হচ্ছে  এবং কোন কোন সময় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

স্পর্শকাতর বিষয় এড়িয়ে চলা। সামাজিক বৈচিত্র্য তুলে ধরার প্রতি অঙ্গীকার মানে এই না যে, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বর্ণবাদী রেষারেষিকে এড়িয়ে যাওয়া, বা ধর্ম নিয়ে অস্বস্তিকর ইস্যু  রিপোর্ট না করা।

নিরপেক্ষতা মানে সমতা। প্রতিষ্ঠিত মতামত আর উগ্র মতামতকে একই সময় দেয়া নিরপেক্ষতা নয়।

সাউন্ড বাইট সংস্কৃতি। কিছু সাউন্ড বাইট-এর সংগ্রহ, বিশেষ করে যেগুলো দায় সারার জন্য সংগ্রহ করা হয়েছে, সেগুলো সত্যিকার অর্থে আলোচনা সৃষ্টির করে না বা নানাবিধ মতামতের প্রতিফলন নাও ঘটাতে পারে।

যখন নানা ধরণের মতামত সামনে আসে, তখন সব চেয়ে সহজ কাজ হচ্ছে রিপোর্টার যে ধরণের প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশা করছিলেন, শুধু সেটা ঘিরে মতামতগুলো নির্বাচন করা।

কোন মন্তব্য নেই