কয়েক বছর আগের তুলনায় সাংবাদিকদের এখন অনেক বেশি স্টোরি তৈরি করতে হয়। বেশি কাজের চাপে অর্থাৎ সংখ্যা বাড়ানোর চাপে কোনো কাজেই পূর্ণ তৃপ্তি আসে না। মনে হয় যেন, কিছুই হচ্ছে না। নতুন গল্পের কথা ভাবা বা অনুসন্ধান করার কথা মাথাতেই আসার সুযোগ পায় না। আর এসব করতে করতে অনেকের মনেই করতে থাকেন- তার কাজ শুধু খবর জোগার করা আর দায়িত্বপ্রাপ্তর কাছে জমা দেওয়া। তাছাড়া, ইন্টারনেটে যেভাবে তথ্য এবং অপ-তথ্যের বন্যা, তাতে সেখান থেকে সঠিক তথ্য খুঁজে বের করতে গিয়ে অথৈ সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়ার অবস্থা হয় অনেকের।
সাংবাদিকতা বা সংবাদপত্রের প্রাণ হচ্ছে মৌলিক প্রতিবেদন। যাকে সাংবাদিকরা এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট বলেন। আর এই মৌলিক প্রতিবেদন তৈরির জন্য প্রয়োজন সময়, মনোযোগ আর পরিশ্রম। এর পাশাপাশি কৌতূহল এবং জানার আগ্রহ থাকা জরুরি।
সাংবাদিকতার মানেই হচ্ছে মানুষকে নতুন কিছু বলা। সব সাংবাদিকই চায় মৌলিক কাজ করতে। আর মৌলিক সাংবাদিকতার মানেই হচ্ছে মানুষকে নতুন কিছু বলা, এমন কিছু বলা যেটা তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে, তাদের ধরে রাখবে। প্রকৃত সাংবাদিকদের মধ্যে এই তাড়না থাকা উচিৎ যে –তার কাজ কতটুকু মৌলিক বা অরিজিনাল হচ্ছে, কোথা থেকে পরবর্তী অরিজিনাল স্টোরি আসবে?
মনোভাব এবং অভ্যাস
মৌলিক কাজের জন্য প্রয়োজন সময়, মনোযোগ এবং পরিশ্রম। এখানে দায়সারা গোছের কিছু করলে চলবে না – এখানে কঠোর পরিশ্রম দরকার, শুধু কয়েকদিনের জন্য নয়, অনবরত। এখানে মনোভাবের প্রয়োজন হতে পারে এবং অভ্যাসের প্রয়োজন নির্ঘাত হবে।
কৌতূহল
আপনি যদি পুরোপুরি উৎসুক না হন, তাহলে আপনি আপনার সময় নষ্ট করছেন। কিছু জানার ইচ্ছা দিয়েই স্টোরি খোঁজার কাজ শুরু হয়। আপনি যদি কখনোই নিজের একটি স্টোরি আইডিয়া মাথায় নিয়ে কাজে না আসেন, তাহলে আপনার স্টোরি খোঁজার কৌশল রপ্ত করা উচিৎ।
একটি দৃষ্টান্ত- একজন তুখড় সাংবাদিক একটি রাস্তার পুরোটা হেঁটে সবাইকে চ্যালেঞ্জ করতেন যে, তিনি সেই রাস্তার ৫০০ গজের মধ্যে অন্য সবার চেয়ে বেশি স্টোরি খুঁজে পাবেন – যেমন, রাস্তায় ময়লার পরিমাণ, পার্ক করার সুবিধা, নতুন গাড়ির সংখ্যা, ট্রাফিক পুলিশ, কফির দোকান ধুমপানরত লোকজনে ভরা, কারণ অফিসে সিগারেট খাওয়া নিষেধ, দোকান খুলেছে, বন্ধ হচ্ছে, রাস্তায় ভিক্ষুক, নতুন বাড়ি-ঘর তৈরি হচ্ছে।
আমরা কত দিন একটি নির্মাণাধীন ভবনের পাশ দিয়ে যাই কিন্তু কখনো জিজ্ঞেস করি না, আপনারা এখানে কী বানাচ্ছেন? এভাবে প্রশ্ন করলেই কিন্তু অনেক নতুন তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
আরেকভাবে ভাবতে পারেন: আপনার মনে জানার আগ্রহ এতই প্রবল হতে হবে যে, আপনি একটি সাদা দেয়াল দেখে জানতে চাইবেন, এই দেয়ালে কিছুই নাই কেন? প্রশ্ন করুন, কেন .... এবং তারপর, কেন না।
কৌতূহল জাগানোর একটি সহজ কৌশল হতে পারে এমন
আপনি যা দেখলেন বা শুনলেন বা পড়লেন, সেটা দিয়ে যেসব প্রশ্নের জবাব পান নি, সেসব প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করতে নিজেকে বাধ্য করুন। পত্রিকার ‘সংক্ষেপে বিশ্ব খবর’ বা এরকম সংক্ষিপ্ত খবরের সেকশনে গিয়ে প্র্যাকটিস করুন – সেখানে সব চেয়ে ছোট খবরটি পড়ুন এবং ঐ কয়েক লাইনে যেসব প্রশ্নের জবাব নেই, সেই প্রশ্নগুলো ভাবুন। নিজের প্রতিক্রিয়া দেখুন। যে কোন স্টোরি বা ঘটনা নিয়ে আপনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কী ছিল সেটা শুনুন। শুরু করার জন্য কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে নিরপেক্ষতা থেকে সরিয়ে নিন। আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়া বা প্রথম চিন্তা কী ছিল? অন্যান্যরা কি তাই ভাববে? যখন আপনি আপনার প্রতিক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করবেন, তখন কী হবে? আপনার ভাবনাকে সেটা কোথায় নিয়ে যাবে? আর আপনি প্রতিদিন যেসব জিনিস নিয়ে কাজ করেন সেগুলো নিয়েই প্র্যাকটিস করুন – দেখবেন, হয়তো অন্যান্যরা যেটা দেখতে পারেনি, আপনি সেটাই খুঁজে পাবেন।
বিবিসি নিউজ নাইট-এর মাইকেল ক্রিক বলেন: এমনকি যখন প্রতিদিনের সাধারণ একঘেঁয়ে প্রযোজনার কাজ করছেন, সব সময় জিজ্ঞেস করুন, ‘আমি এমন কী বলতে পারি, যেটা এই স্টোরির জন্য নতুন কিছু হবে?
এই ভাবে চিন্তার প্রক্রিয়া শুরু করার বড় দিক হচ্ছে, আপনাকে কোনো কিছুই জানতে হবে না। শুধু উৎসুক হোন আর ভাবুন।
একজন সিনিয়র সম্পাদক উত্তর ইংল্যান্ডের এক স্থানীয় রেডিও স্টেশনে তার প্রথম অ্যাসাইনমেন্টের অভিজ্ঞতা দেখুন কতোটা মজার!-
‘আমি কিছুই জানতাম না। আমি ঐ শহরকে চিনতাম না, আমার কোনো কন্টাক্ট ছিল না, কোথায় শুরু করতে হবে তাও জানতাম না। তারপর প্রধানমন্ত্রী – তখন ক্ষমতায় ছিলেন মারগারেট থ্যাচার - আফগানিস্তানে আক্রমণ চালানোর কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের (রাশিয়া) বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন।
আমার হাতে তখন তেমন কোনো কাজ ছিল না। আমি তখন নিজেকে স্থানীয় একজন ব্যবসায়ীর জায়গায় কল্পনা করলাম। তারপর স্থানীয় এক রপ্তানিকারক কোম্পানির প্রধান নির্বাহীকে টেলিফোন করলাম। এর আগে কখনোই তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়নি। তিনি ক্ষমতাসীন টোরি দলের স্থানীয় একজন নেতা ছিলেন এবং সরকারের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত ছিলেন। তার সাথে সাক্ষাৎকার আমাদের নিউজ বুলেটিনের লিড স্টোরি হয়ে যায়! সাক্ষাৎকারের ফলো-আপ দিয়ে স্থানীয় পত্রিকা এবং আঞ্চলিক টেলিভিশনের প্রধান খবর হয়ে যায়!

কোন মন্তব্য নেই