কারাগারে ১২২ ধর্ষকের সাক্ষাৎকার

Share:
Madhumita Pandey, 26, has interviewed 100 convicted rapists in India
মধুমিতা পান্ডে
সাত বছর আগে, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১২ তারিখে, নয়াদিল্লিতে বসবাসরত ২৩ বছর বয়সী ফিজিওথেরাপিস্ট জ্যোতি সিং, একজন পুরুষ বন্ধু নিয়ে লাইফ অব পাই চলচ্চিত্রটি দেখার পর বাড়ি ফেরার জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করছিলেন।  কিছুক্ষণের মধ্যে তারা একটি বাস পেয়ে যান।  চালকসহ ছয়জন পুরুষ ছিল বাসে।
চলন্ত বাসে, ওই ছয়জন তাদের লাঞ্ছিত করে।  সিং গণধর্ষণের শিকার হন এবং তার বন্ধুকে মারাত্মকভাবে মারধর করে তারা। সিংয়ের পেটে ও অন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল।  তাকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।  কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ পর তিনি মারা যান।

সেই পাঁচজনকে পরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।  আসামিদের মধ্যে নবীনতম, এক কিশোরকে তিন বছরের জন্য পাঠানো হয়েছিল সংশোধন কেন্দ্রে এবং পরে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।  একজনের রহস্যজনকভাবে কারাগারে মৃত্যু ঘটে।

সাউথ ওয়েলসে ব্যাঙ্গর বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লিনিকাল মনোবিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করা মধুমিতা পাণ্ডের জন্য এ ঘটনাটি ছিল দুর্দান্ত, একই সঙ্গে হতাশাজনক।

"এটা হতাশাজনক ছিল এবং আমি ক্ষুব্ধ ছিলাম," বলে পান্ডে। "আমি সবসময় এই শহরকে আগে একটি ভিন্ন আলোতে দেখেছি।" তিনি বুঝতে শুরু করলেন, প্রায় রাতারাতি ভারত সম্পর্কে তার পূর্ব ধারণাগুলো পাল্টাতে শুরু করেছে।  হঠাৎ, দিল্লি বিশ্বের "ধর্ষণের রাজধানী’ খেতাব পায় - যদিও পরিসংখ্যান খুব একটা নির্ভরযোগ্য নয়।  কারণ সমাজ কলঙ্ক দেবে ভেবে অনেক নারী ধর্ষণের কথা প্রকাশ করেন না। 

ভারতের জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে ভারতের ধর্ষণের ঘটনা সংখ্যা ২৪ হাজার ৯৩২ বেড়ে ৩৪ হাজার ৬৫১টি হয়েছে।  কিন্তু বিশেষজ্ঞরা প্রকৃত পরিসংখ্যান আরো বেশি বলে মনে করেন।

এই ধর্ষকরা ধর্ষণের ঠিক আগ মুহূর্তে বা ধর্ষণের সময় কী ভাবছিল তা জানা, অর্থাৎ এদের মনো-বিশ্লেষণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন পান্ডে।  তিনি ধর্ষকদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

মার্চ, ২০১৩ সাল, দিল্লির ঘটনার তিন মাস পর, পাণ্ডে দিল্লির তিহার কেন্দ্রীয় কারাগারে একশর বেশি দোষী সাব্যস্ত ধর্ষকের সাথে কথা বলতে অনুমতি দেওয়ার জন্য আবেদন করেন। ব্রিটিশ সাইকোলজিক্যাল সোসাইটি কর্তৃক নির্ধারিত নৈতিক নির্দেশিকাগুলো অনুসরণ করে তিনি বলেন, তিনি কেবল আগ্রহী অংশগ্রহণকারীদেরই সাক্ষাত্কার করবেন।

তিনি বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই প্রত্যাশা করেননি যে, ওই অস্বস্তিকর ঘটনার বর্ণনায় নিজের গল্পটি বিশ্বস্ততার সঙ্গে আলাপে আনবে। 

পাণ্ডে প্রতিটি ধর্ষকের বিপরীতে একটি শনাক্তকরণ সংখ্যা ব্যবহার করেছেন। কোথাও তাদের নাম ব্যবহার করেননি। তার সাক্ষাত্কারগুলোতে স্পষ্ট যে, ধর্ষণকরা সাধারণভাবে নারীদের ওপরই দোষ চাপায়, তাদের খারাপ  মেয়ে বলে।  নারীদের সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি মোটেও সম্মানজনক নয়।  কিন্তু একই সঙ্গে তাদের মধ্যে অনুতাপের কোনো লক্ষণ না দেখে অবাক হন পান্ডে।  তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেণ একজন ৪৯ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি ৫ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।  সাক্ষাত্কারের সময় ততোদিনে তার পাঁচ বছর কারাবাস হয়ে গেছে।  তিনি অনুশোচনা করছিলেন। কিন্তু এ ধরনের অপরাধে মানুষ সাধারণত যে ধরনের  অনুতাপ আশা করে এটা তেমন ছিল না।

লোকটি বলছিলেন,  মেয়েটি ধর্ষণের কলঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছে (এবং নিশ্চিতভাবে সে আর কুমারী নয়)।  সে আর ভালো ও উপযুক্ত স্বামী খুঁজে পাবে না। তিনি মুক্ত হয়ে গেলে তাকেই বিয়ে করে তার কৃতকর্মের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করবেন।   পান্ডে বলেন, এই লোকটি বুঝতেই পারছেন না যে একজন ধর্ষিতা এরকমটি কখনোই চান না।  তার সেকেলে মনস্তত্ত্ব, তিনি ভাবছেন, বিয়ে হওয়ার আগে পর্যন্ত একজন নারীকে অবশ্য শুদ্ধ (কুমারী) থাকতে হবে। তা না হলে সেটা তার জন্যই ক্ষতিকর।

ধর্ষণ সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত নানা ধ্যান ধারণার প্রতি পাণ্ডে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকেই দোষারোপ করতে ভুল অথবা মিথ্যা তথ্য কীভাবে প্রচার পেয়ে যায়।  যখন একজন নারী নিজেকে প্রকাশ করতে চায়, আঁটোসাঁটো পোশাক পরে তার শরীরের ভাঁজ বুঝা এমন পোশাক পরে তখন অনেকেই বলেন, এ ধরনের আচরণ ও পোশাকের কারণেই ধর্ষণের শিকার হয়।  কিন্তু জ্যোতি সিংয়ের ক্ষেত্রে এই ধারণ মার খেয়েছে। কারণ তার মধ্যে প্রদর্শনেচ্ছা ছিল না, তিনি একজন পুরুষ সঙ্গীর সাথে ভ্রমণ করছিলেন।  তিনি একজন শহরের মেয়ে, যিনি দিল্লীকে ভালভাবে চিনতেন।  তিনি বুদ্ধিমান, শিক্ষিত, পরিশ্রমী ছিলেন।  কিন্তু তারপরও ধর্ষিত হয়েছেন। 

কয়েক মাস ধরে তিন পর্যায়ে পাণ্ডে ধর্ষণের দায়ে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ১২২ জনের সাক্ষাৎকার নেন ।  সাক্ষাত্কারের পাশাপাশি, তিনি তাদের দুটি প্রশ্নপত্র পূরণ করতে বলেছিলেন।  এর মধ্যে একটি ছিল নারীদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি।  এবং দ্বিতীয়টি হরো এমএমআইএস সম্পর্কিত।  অর্থাৎ তাদের সংস্কৃতি পুরুষকে নারীর সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে শিক্ষা দেয়। 

এই সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতা থেকে পাণ্ডে বলেন, ধারণাগত বিকৃতির একটি প্যাটার্ন তিনি দেখেছেন।  ধর্ষকরা তাদের কৃতকর্মের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে ধর্ষণের ওই গল্পের নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করেছে। 

পান্ডে বলেন, বাসটির চালক মুকেশ সিং এবং তার ভাই রাম সিং এমন মনোভাবের ক্লাসিক উদাহরণ। আমি যেসব ধর্ষকের সাথে কথা বলেছিলাম, তাদের কথাবার্তাও একই রকম ছিল। 

বিবিসির একটি তথ্যচিত্রের জন্য কারাগারে সাক্ষাত্কার নেওয়ার সময় মুকেশ সিং দাবি করেছিলেন যে, যদি জ্যোতি এবং তার পুরুষ বন্ধু পাল্টা আক্রমণের  চেষ্টা না করতো তাহলে বাসের ওই ছয় পুরুষ তাদের এত মারাত্মকভাবে মারধর করত না।  তিনি ঘটনাটি একটি "দুর্ঘটনা" হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে, রাতে বাইরে যাওয়া যেসব নারী যৌন হয়রানির শিকার হয় তাদের নিজেদেরই দোষারোপ করা উচিত।  সিংহের মতো, পাণ্ডের সাক্ষাত্কারে অংশ নেওয়া অন্য ধর্ষকদেরও যৌনতার ক্ষেত্রে অপরপক্ষের সম্মতির নেওয়ার বিষয়ে সচেতনতার অভাব দেখা গেছে। 

ধর্ষণ ছাড়া অন্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত কয়েদিদের এ ব্যাপারে দৃষ্টি কেমন তা জানতে পান্ডেই একই কারাগারের ৬৫ জন কয়েদির সাক্ষাৎকার নেন। এরা সবাই হত্যা মামলার আসামি। তাদের সাক্ষাৎকারে ধর্ষণের ব্যাপারে উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে। 

পান্ডে বলেন, "কয়েকজন ব্যতিক্রম ছাড়া, খুনিরা স্পষ্টভাবে তাদের অপরাধের জন্য নিজেদের দোষারোপ করে।  হত্যার ঘটনাটি পরিকল্পিত হোক বা বেসামাল রাগের মাথায় ঘটে থাকুক, তারা এতে দুঃখ প্রকাশ করেছিল এবং বুঝতে পেরেছিল যে তাদের কর্মের ফলে অন্য লোকের জীবন ধ্বংস হয়েছে।  ধর্ষকদের ক্ষেত্রে এমটা দেখা যায়নি। 

নভেম্বর, ২০১৬ সাল, পাণ্ডে নিউ অরলিন্সে অনুষ্ঠিত আমেরিকান সোসাইটি অব ক্রিমিনোলজি'র বার্ষিক সম্মেলনে একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি বলেণ, ধর্ষকরা তাদের অপরাধের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য নানা অজুহাত খাড়া করে।  তিনি বলেন, "বেশিরভাগ দোষী সাব্যস্ত ধর্ষক নিজেদের অপরাধ নিয়ে অনুতপ্ত নয়, এমনকি এটির ন্যায্যকতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।" সাক্ষাৎকারে তারা পাণ্ডেকে বলেছিল, তাদের দ্বারা ধর্ষিত নারীরা কীভাবে আলগা পোশাক পরে ছিল, তাদের শরীরের ভাঁজ ও ভাষা যেন তাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল। এবং সমস্ত পুরুষই তাদের ধর্ষণের  ইচ্ছা প্রকাশ করেছে এবং মনে মনে ধর্ষণ করেছে। খালি তারা ফেঁসে গেছে!

"অন্যদিকে, যারা অনুতপ্ত হয়েছিল তারা বিশ্বাস করেছিল যে তাদের কাজ নৈতিকভাবে নিন্দনীয়।  কিন্তু মদ, ড্রাগ, খারাপ সঙ্গ বা এড়িয়ে যাওয়া যেত এমন আকর্ষক পরিস্থিতিতে পড়ে তারা অপরাধটি করে ফেলেছে।”

পাণ্ডে বলেন, যদিও যৌন নির্যাতনের প্রতি আমাদের প্রচণ্ড ঘৃণা রয়েছে এবং থাকবে, এবং যারা অপরাধ করার পর দোষ স্বীকার করে তাদের প্রতিও ঘৃণা থাকবে, তারপরও নারীদের প্রতি ক্রমবর্ধমান যৌন সহিংসতা নিরসনে ধর্ষকদের মনোস্তত্ত্ব বুঝা ও মূল্যায়ন করাটাও জরুরি।

কোন মন্তব্য নেই