হিরো আলম নিয়ে মধ্যবিত্তের জ্বালা

Share:

hero alom and his wife
হিরো আলম ও তার স্ত্রী

 হিরো আলম, আসল নাম কিন্তু আশরাফুল হোসেন আলম। সোশ্যাল মিডিয়ায় হিরো আলম নাম ধারণ করে আত্মপ্রকাশের যে হিম্মত সেটিকে অনেকে হয়তো বেয়াক্কেলের আত্মম্ভরিতা বা মার্কেটিং পলিসি হিসেবে অভিহিত করতে পারেন। কিন্তু নিজের চেহারা ও অজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন থাকার পরও এমন একটি নাম নিয়ে পাবলিকলি নিজেকে প্রকাশ করা এবং নিজেকে হিরো হিসেবে উপস্থাপনের খুবই অ্যামেচার বা কোনো ক্ষেত্রে হাস্যকর চেষ্টা, একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো বিষয় কিন্তু নয়।

ধারণা করি, বগুড়ার এক মফস্বলের ডিশ (টিভি ক্যাবল নেটওয়ার্ক) ব্যবসায়ী আশরাফুল আলম (এলাকায় সম্ভবত আলম নামেই পরিচিত) ব্যবসার ধরনের কল্যাণেই কিছুটা পাওয়ার প্রাকটিস করার সুযোগ পেয়েছেন। তার আত্মবিশ্বাসের ভিতটা হয়তো তখনই তৈরি হয়েছে। আর ডিশ ব্যবসায়ীরা মহল্লাভিত্তিক বিজ্ঞাপন থেকে খানিকটা আয়ের জন্য বা শখ থেকে ভিসিডি/ডিভিডি ফিড বিনামূল্যে সম্প্রচার করে। সেই ফিডে সাধারণত মিউজিক ভিডিও বা বাংলা/হিন্দি/তামিল সিনেমা চালানো হয়। এই সংযোগ থেকেই হয়তো নিজেই সিনেমা বা মিউজিক ভিডিও বানানোর নেশায় পেয়ে বসে আশরাফুল আলমকে। আর ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও পাওয়ার প্রাকটিসের যে সুযোগটি তিনি পেয়েছেন সেখান থেকে কিছু মেগালোম্যানিয়াক হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে কারণে তিনি প্রথম চান্সেই নিজেকে নায়ক ঘোষণা করেছেন। তার চেয়ে দ্বিগুণ দৈর্ঘ্য-প্রস্থ এবং ওজনের নায়িকাদের সঙ্গে তাকে নায়কের পার্ট করতে দেখা যায়। বাংলা সিনেমার অনুকরণে অবশ্য নায়িকাদের কোলে নেওয়ার চেষ্টা তাকে কখনো করতে দেখা যায় না।

ব্যাপারটা ক্লিক করে গেছে দেশে ফেসবুক ইউটিউব আসার পর। ঢাকার মানুষ যখন আশরাফুল আলমকে হিরো হিসেবে দেখেছে ততদিনে কিন্তু এলাকায় তিনি হিরো আলম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছেন। শহরের বেড়ে ওঠা শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা এমন অদ্ভুত দর্শন জিনিস কখনো দেখেননি। তারা হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন হিরো আলমের কনটেন্টে। রাজধানীর মানুষকে ইমপ্রেস করতে পারার পর হিরো আলমের আত্মিবশ্বাস আকাশে উঠে গেছে। তিনি তখন আগের চেয়ে বেশি ফ্রিকুয়েন্সিতে কনটেন্ট বানাতে শুরু করেন। এদিকে টিআরপি আর ট্রাফিক মোঙ্গার মিডিয়া তাকে লুফে নিতে থাকে। সম্ভবত ঢাকার এমন কোনো মিডিয়া হাউস নাই যে হিরো আলমের ইন্টারভিউ করেনি। উৎসাহ পেয়ে হিরো আলম আগ্রহ নিয়ে সাক্ষাৎকার দেওয়া শুরু করলেন। কেউ ডাকলে না করেন না। অবশ্য তাতে কিছু অর্থযোগ ঘটছিল। বারবার বগুড়া থেকে আসার ঝামেলা, তাই তিনি ঢাকায় বাসা নিয়ে থাকতে শুরু করেন। কিন্তু খুব শিগগিরই তিনি বুঝতে পারেন ঢাকার মানুষেরা আসলে তার কদর করছে না, তাকে ন্যূনতম ইজ্জতও দিচ্ছে না। পেছনে তাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা তুচ্ছতাচ্ছিল্য চলছে। ২০১৬ সালে আমার সাবেক অফিসে ইন্টারভিউ দিতে এসে সেই দুঃখের কথা তিনি অকপটে বলেছিলেনও।

শহরের ‘উচ্চ’ রুচিবান নাগরিকদের অবহেলা তাচ্ছিল্য নিয়ে মনের দুঃখে সেই বগুড়াতে ফিরে যান হিরো আলম। এবার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা। এক কম্পোজার ছেলে সম্ভবত তাকে দারুণ সহায়তা করেছে। তাকে নিয়ে হিরো আলম নিজস্ব স্টুডিও করেছেন। ঢাকায় বহুজনের কথায় সিনেমায় অভিনয় করতে গিয়েও চূড়ান্তভাবে অপমানিত হয়েছেন হিরো আলম। সিনেমার মতো বড় আয়োজনের দিকে আর নজর দেননি। মনোযোগ দিয়েছেন নিজের কণ্ঠে বিভিন্ন গান কভার করা এবং মিউজিক ভিডিও নির্মাণে। সাম্প্রতিককালের হেন কোনো জনপ্রিয় গান নেই যা তিনি নিজে গাননি এবং সেটার মিউজিক ভিডিও বানাননি। সেসব ভিডিওর সিংহভাগ ভিউয়ার সম্ভবত ঢাকার রুচিবান সংস্কৃতিবানেরাই। হিরো আলম প্রচুর ভিউ পেয়েছেন, সঙ্গে টাকাও।

বিশেষ করে সংগীত সম্পর্কিত বড় কোনো ইভেন্টই মিস করেননি হিরো আলম। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লোকজনকে মৃদু আপত্তি জানাতে দেখা গেছে। কিন্তু বিপত্তিটা বেঁধেছে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে গিয়ে। 

বলে রাখা দরকার, হিরো আলমকে যেভাবে  গান গাইতে দেখা যায়, সেটাই তার স্টাইল। এখানে সত্যিই কোনো কৃত্রিমতা নেই। তাল লয় হীন বেসুরো গায়কী আর অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গিই রুচিবানেরা দাঁত কেলিয়ে গিলছেন। হিরো আলম এ নিয়ে বহুবার সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিকৃতি তার দ্বারা সম্ভব নয়। তিনি সেই মাপের কেউ নন।

তাহলে রবীন্দ্র সংগীত গাওয়া নিয়ে কেন এতো আপত্তি। তাকে পুলিশ দিয়ে প্যাদানি দেওয়ার বাসনা প্রকাশ করেছেন অনেকে। পরে হাইকোর্টের এক আইনজীবী ‘গণউৎপাত’ সৃষ্টির দায়ে তাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। এরপর ডিবি পুলিশ হিরো আলমকে কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে ডেকে তুলে নিয়ে গিয়ে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। বিবিসি বাংলা ও ডেইলি স্টার বাংলায় সেই ঘটনার বীভৎস বর্ণনা দিয়েছেন হিরো আলম। পুলিশ তার সাথে যে আচরণ করেছে রীতিমতো ন্যক্কারজনক, এখতিয়ার বহির্ভুত এবং অত্যন্ত আপত্তিকর। 

পোড় খাওয়া হিরো আলম কিন্তু তার নাগরিক অধিকারের কথা স্পষ্ট করেই বলেছেন। তার সাথে অন্যায় করা হয়েছে সে কথা  তিনি বুক চেতিয়ে বলেছেন।

হিরো আলমের এই অপমানে, হিউমিলিয়েশনে যে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তর অর্গাজম হলো তাদের এই দশা হলো কী করে? তারা না মানবাধিকার, উদারতা, সহিষ্ণুতার ওকালতি করেন! তারা কেন হিরো আলমের মতো একজন অসুন্দর, অশিক্ষিত, গরিব, ছোটলোককে সহ্য করতে পারছেন না? এতো দুর্বল একটা লোককেই কেন তারা শায়েস্তা করতে চাইতেছেন? পুলিশ লেলিয়ে দিতে চাইতেছেন?

সংস্কৃতির ঝাণ্ডাধারীরা কি তাদের থলি থেকে ব্যর্থতার কুৎসিত মুষিক বেরিয়ে যাওয়ায় খুব অস্বস্তি বোধ করছেন? তাদের রবীন্দ্র সংগীত তো কেউ শোনে না। হিরো আলম বিকৃত, বীভৎসভাবে গেয়ে লাখ লাখ ভিউ পেয়ে যাচ্ছেন, এই লজ্জা তারা কোথায় রাখবেন!

ছোটলোকদের অমার্জিত, অশুদ্ধ শিল্প সংস্কৃতি চর্চা নিয়ে এই মধ্যবিত্তের আরেকটি কারণ হতে পারে শিক্ষিত হওয়ার অহমিকা। শিল্প সংস্কৃতি চর্চা শিক্ষিতদের কারবার, এটা কিন্তু সত্য। ছোটলোকদের এখানে প্রবেশ করতে চাওয়ার চেষ্টা অনধিকার চর্চা হিসেবেই তারা দেখেন। কিন্তু ছোটলোকদের কাছ থেকে ধার করা ভিত্তির ওপর শিক্ষিতদের যে শিল্প সংস্কৃতির দালান গড়ে উঠেছে সেখানে ছোটলোকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা যায় কি? যেমন এটিকেট না জানার কারণে ইটভাটা শ্রমিককে ঢাকার আকাশচুম্বি দালানকোঠায় ঢুকতে দেওয়া হবে না? তাকে লাঠি নিয়ে বা কুত্তা লেলিয়ে তাড়াতে হবে? এটা কিন্তু বলা যায় মধ্যবিত্তের ছোটলোকি স্বভাব।

এটা কি রবীন্দ্র মৌলবাদ বা রবীন্দ্রনাথের প্রতি অতিভক্তির সহিংস প্রকাশ? না মনে হয়। কালচার্ড বাঙালির স্ট্যান্ডার্ড এখনো রবীন্দ্রনাথ। এখানে রবীন্দ্রনাথকে সে কিন্তু পাঠ করে না, চর্চা তো দূরের কথা। এক অজানা রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে থাকা, রক্ষা করাই তার অত্যন্ত অরক্ষিত অস্তিত্বের সার। কারণ হিরো আলমের পারফরমেন্স নিয়ে প্রতিক্রিয়াগুলোর ধারাবাহিকতা তেমন ধারণাই দিচ্ছে। দেখা মনে হচ্ছে, এতোদিন তোকে সহ্য করা হয়েছে। কিন্তু তুই যখন রবীন্দ্রনাথে হাত দিয়েছিস, এবার কিন্তু ছেড়ে কথা বলবো না। এতোটা বাড়াবাড়ি সহ্য করা হবে না।

হিরো আলম কিন্তু এটা জানেন। এবং তিনি সেটা কেয়ার করেন না। তিনি মধ্যবিত্তকেই চ্যালেঞ্জ করে বসেছেন। মধ্যবিত্তের সংগীত সন্ধ্যা মার খেয়ে গেছে, কিন্তু হিরো আলম ময়দান কাঁপিয়ে দিচ্ছেন! তার তো শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মতো শিল্পগুণ বিচারের দায় নেই। তিনি হতে পারতেন মধ্যবিত্তের কোষ্ঠকাঠিন্যের দাওয়াই। কিন্তু না, ঢাকা নামক গ্রামের মধ্যবিত্তরা নিচের দিকে তাকিয়ে দেখবেন না যে তার প্যান্ট/পায়জামা কবে কোথায় খুলে পড়ে গেছে। 

সোশ্যাল এলিয়েনেশনে ডুবে থাকা মধ্যবিত্ত তার সমাজের কালেকটিভ অ্যাবিলিটি সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখে না। ঘরের কোনে সে একা যা ভাবতেছে সেটিকেই বৃহত্তর সমাজের নর্ম বলে ভাবতেছে। তার আচরণে পদে পদে যে স্ববিরোধিতা সেটি কি সে বোঝে? মনে হয় না সে তার মেনিফেস্টেশনের ব্যাপারে অতোটা সচেতন। কারণ তার তো সমাজে আন্তঃযোগাযোগ নেই। মানুষের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও অ্যাক্ট সম্পর্কে সে একটা ধারণা নিয়ে এক মিথ্যা আত্মবিশ্বাসের সুতায় ভরে করে জীবন পার করে দিচ্ছে।

এবং এই যে ছোটলোকদের পারফরমেন্স আর্ট মধ্যবিত্ত বা বড়লোকদের তাচ্ছিল্য এবং ডিনায়াল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উপভোগ করছে, হিরো আলমের মতো ছোটলোকেরা যদি মধ্যবিত্তের সেই মানসিকতাকেই ম্যালিপুলেট করে অর্থ উপার্জনের কৌশল নেয় তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়ায়। মধ্যবিত্ত আঁতেলরা কি সেটা ভেবে দেখেছেন? এটা ভাবলে সম্ভবত তারা এ ধরনের ‘উৎপাত’ ‘উপদ্রব’ উপেক্ষা করার মতো স্থৈর্য হাসিল করতে পারবেন।

আরেকটি কথা না বললেই নয়, হিরো আলমকে শায়েস্তা করতে পেরে উল্লসিত আঁতেলরা এ ধরনের রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীলতার সমালোচনাকারীদের হিরো আলমের ফ্যান তকমা দিচ্ছেন। এটা খুবই হাস্যকর সিলি একটা ইন্টারপ্রিটেশন। হিরো আলমের মিউজিক ভিডিও আর অনন্ত জলিলের সিনেমা কেউই এমনকি হিরো আলমের মতো ছোটলোকেরাও উচ্চ মানের বিনোদন হিসেবে দেখে না। সবাই তাদের ননসেন্স, সিলিনেসটাকেই উপভোগ করে। কিন্তু প্রশ্নটা যখন সহিষ্ণুতার, অধিকারের তখন প্রশাসন এবং শিক্ষিত সমাজের পক্ষ থেকে এই ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপনকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। আমরা বগুড়ায় ডিবি অফিসে হিরো আলমের সঙ্গে পুলিশের আচরণের যে বর্ণনা পাচ্ছি তা রীতিমতো বর্ণবাদী, শ্রেণিঘৃণার কদর্য প্রকাশ। 

কোন মন্তব্য নেই