মাসনা সুলাসা রুবায়া নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় যেভাবে দ্বীনি ভাইয়েরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন তাতে মনে হচ্ছে এইটার একটা হেস্তন্যাস্ত না করলে আর ইসলাম উদ্ধার করা যাইতেছে না!
প্রথম পক্ষই মূলত এই বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তাদের আক্ষেপ মাসনা সুলাসা রুবায়ার দরকারি আমলটা মুসলমানেরা কেন বন্ধ করে দিয়েছে? তারা কি পশ্চিমা কালচারাল উপনিবেশের চাপ বা দেশীয় পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিতদের সমালোচনা বা বুলিংয়ের ভয় করছেন? মর্দে মুমিন কেন এই ইহুদি নাসারা, কাফের মুশরিকদের ডরাবে?
দেশে কতো বিধবা নারীদের গতি হচ্ছে না, তারা সন্তানাদী নিয়ে কী মানবেতর জীবন যাপন করছে! কতো গরিব কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা আছেন। কতো এতিম, কতো মেয়ের বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে, তার কারণে এলাকার যুবকেরা জাহান্নামি হচ্ছে। সমাজে কতো পাপ, কতো বেহায়াপনা, কতো অশ্লীলতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এইসব আবিয়াত্তা বা বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত যুবতিরা!
আবার কতো মুমিন পুরুষ তার যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে না পেরে বেগানা নারীর দিকে মনোযোগ দিয়ে আখেরাত নষ্ট করে যাচ্ছে। আবার কতো মুমিন যৌনতায় তৃপ্ত হলেও মনের মতো মানুষ খুঁজে না পাওয়ার আক্ষেপে নামাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না! এই আমল দিয়ে অনৈতিক ও বিকৃত (সমকামিতা, এলজিবিটিকিউ) যৌনতা ঠেকাবেন তারা।
অপরপক্ষ বলছে, ইসলামে একাধিক বিয়ে অনুমোদনের বিকৃত ব্যাখ্যা করছেন এই তথাকথিত আলেমেরা। তারা মূলত নিজেদের যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্যই বা যৌন হতাশা থেকেই এই মাসনা সুলাসা রুবায়ার জিগির তুলেছেন। একে তারা আমল হিসেবে প্রচার করছেন। অনুমোদন থাকলেও নিরুৎসাহিত করা একটি কাজকে যার সাথে যৌনতার সরাসরি যোগ আছে সেটিকে এভাবে গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে প্রচারের ফলে ইসলামের সুদূরপ্রসারী ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তাঁরা। তাঁরা মূলত অপেক্ষাকৃত লিবারেল ইসলামের সৈনিক। অথবা শুধুই বিশ্বাসী, যারা আধুনিক লিবারেল সোসাইটির শ্রেষ্ঠ বিধান হিসেবে ইসলামকে দেখতে বা দেখাতে চান।
এখন ইসলামে মাসনা সুলাসা ও রুবায়া বিষয়ে আলাপের ভঙ্গিটা একটু দেখা যাক। এ সম্পর্কিত আয়াতটি এরকম:
তোমরা বিবাহ করবে নারীদের মধ্যে যাকে তোমার ভালো লাগে—দুই, তিন অথবা চার। আর যদি আশঙ্কা করো যে সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে একজনকে (বিয়ে করো)...।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩)
আলেমেরা বলেন, দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতির প্রয়োজন নেই। যদিও বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইনে প্রথম স্ত্র্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক করা আছে। কিন্তু ধর্মীয় ব্যাপারে আলেমদের কথাই চূড়ান্ত।
তবে সম্ভবত অধিকাংশ আলেমই একমত যে, ইসলামে বহুবিবাহ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ তাতে ইনসাফ করার শর্ত পূরণ প্রায় অসম্ভব। নবী (সা.) নিজেও নিরুৎসাহিত করেছেন।
এখন একপক্ষ এইটাকে আমলের অংশ হিসেবে প্রচার করার পেছনের ধান্দাটা আসলে কী? সাবেক চিত্রনায়িকা এবং একজন ক্রিকেটারের সাবেক প্রেমিকা হঠাৎ করে দ্বীনদার হওয়ার বছর কয়েক পর থেকে এই নিয়ে ব্যাপকভাবে দাওয়াতি কাজ শুরু করেছেন। তিনি ফেসবুকে রীতিমতো ঘটকালি করছেন। বিতর্কটা শুরু হয়েছে মূলত তাঁর ফেসবুক পোস্ট থেকেই। এতোদিন অনেক আলেমই এ নিয়ে কথা বললেও লিবারেল মুসলিমদের নজরে তেমন পড়েনি বলেই মনে হয়।
আইন অনুযায়ী ১. বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব, ২. শারীরিক মারাত্মক দুর্বলতা, ৩. দাম্পত্য জীবন সম্পর্কিত শারীরিক অযোগ্যতা, ৪. দাম্পত্য অধিকার পুনর্বহালের জন্য আদালত থেকে প্রদত্ত কোনো আদেশ বা ডিক্রি বর্জন, ৫. মানসিকভাবে অসুস্থতা ইত্যাদি পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় বিয়ে করার অনুমতি আছে। আলেমেরাও অবশ্য এসব শর্তে আপত্তি জানাননি।
তবে মাসনা সুলাসার নয়া অ্যাকিভিস্টদের যুক্তি এরকম: কিছু ঋণ করে হলেও বিয়ে করেই ফেলুন! এই সমাজ তোমাকে ভাল কিছু দিতে চায় না! বরং তোমাকে পাপের সাগরে ডুবাতে চায়। শেষ হয়ে যাচ্ছে যুবকদের চরিত্র, পারে না যৌবনকে রাখতে পবিত্র। কারণ যৌবন হচ্ছে এক ধরণের ক্ষুদা। কিন্তু সমাজ বলছে আগে প্রতিষ্ঠিত হও। তারপর বিয়ের পিঁড়িতে বসো। বিয়ে করো... তোমায় প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব আমি আল্লাহর। অভাবে আছো অভাব দূর করে দেব। আল্লাহ বলেন ধনী হতে চাও বিয়ে করো।
মাসনা সুলাসার বিজ্ঞাপনগুলোতে দেখা যায় এভাবে বলা থাকে: প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া আছে। স্বামী ইনসাফ করতে না পারলে প্রথম স্ত্রী ছাড় দিতে প্রস্তুত আছেন, ইনশাল্লাহ!
প্রথম স্ত্রীর অনুমতি থাকার ব্যাপারটা কেমন? স্পষ্টত তিনি অক্ষম নন, এরপরও স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান। আমাদের দেশের অধিকাংশ আলেম কর্তৃত্ববাদী পুরুষ। তাঁরা কম শিক্ষিত অনুগত স্ত্রী চান। স্ত্রী আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ স্বামীর ওপর নির্ভরশীল। এমনকি সবজি কেনার জন্যও বাজারে যাওয়ার অনুমতি নেই। এমন সামাজিকভাবে ভালনারেবল একজন মানুষ কি কখনো স্বামীর খায়েশ পূরণে বাগড়া দিতে পারে? আবার পতিসেবা ধর্মের অংশ বলে মেনে নিয়েছেন যারা তাদের মুখ ফুটবে কখনো? এইসব স্ত্রীরা তো স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের আকাঙ্ক্ষার কথা শুনেই আরও হীনম্মন্যতার গর্তের ঢুকে যাবেন। তাঁর শরীর নিয়ে স্বামী সন্তুষ্ট না এই ভাবনাই তো তাকে নিজের অস্তিত্ব বিসর্জনে প্ররোচিত করবে!
বিপরীতে লিবারেল মুসলিমরা বলছেন, এইভাবে সমাজে অশ্লীলতার প্রসার ঠেকানোর কথা বলে চামে নিজেদের অতৃপ্ত যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণেরই পাঁয়তারা করা হচ্ছে। ইসলামে একাধিক বিয়ের অনুমোদনকে স্রেফ যৌনতায় পর্যবসিত করা হচ্ছে। এই ক্যাম্পেইনকে এখনই ঠেকাতে হবে।
একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, উভয়পক্ষেরই কনসার্নের জায়গা কিন্তু একটাই- পশ্চিমী ভাবধারা! আবার উভয়ের কাছেই কিন্তু যৌনতা একটা ট্যাবু। ফলে প্রথম পক্ষ তাদের আকাঙ্ক্ষার কথা স্পষ্ট না করে ইসলামের মোড়কে বলছেন। আর দ্বিতীয় পক্ষ যৌনতার মতো একটা নোংরা অশ্লীল বিষয়ের সঙ্গে ইসলামি জীবনাচারকে গুলিয়ে ফেলার সম্ভাবনা দেখে আগাম তীব্র আপত্তি জানিয়ে রাখছেন! আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগা, যৌন লোলুপ, পার্ভার্ট বলে গোষ্ঠী উদ্ধার করা হইতেছে। বলা হচ্ছে, এরা সময়ের সঙ্গে বোঝাপড়া না করে কেবল যৌনতাকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্যই দ্বিতীয়, তৃতীয় এমনকি চতুর্থ বিয়েও করা যাবে, এভাবে ইসলামকে যাচ্ছেতাইভাবে ব্যাখ্যা করছে। যার কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বেইজ নাই।
এই ভাইবোনদের কেউই বুঝতেছেন না যে, বিয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য যৌনতার লাইসেন্স দেওয়া। একাধিক বিয়ের অনুমোদন দেওয়ার প্রশ্ন ইসলামে যৌনতার বাইরের কোনো মহান উদ্দেশ্যকে সাধন করার জন্য অবতারণা করা হইছে এমন কোনো প্রমাণ দেখাইতে পারবেন না। ইসলামে এটা কোনো নতুন নাজেল করা বিধান নয়। এটা পৃথিবীতে বহু আগে থেকেই ছিল। ইসলাম শুধু সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে মাত্র। কারণ এ নিয়ে বিশৃঙ্খলা অশান্তি ছিল বলেই। এখন আপনারা কি বলবেন ইসলামপূর্ব যুগে মানুষ মহান কোনো উদ্দেশ্যে একাধিক বিয়ে করতো?
আচ্ছা দ্বীনি ভাইয়েরা বোনেরা, যৌনতা নিয়ে কেন আপনাদের মধ্যে এতো সংকোচ, রাখঢাক? মানে ন্যূনতম আলাপ তো করা যাইতেই পারে। যেখানে ইসলামে (কোরআন, হাদিস) যৌনতা নিয়ে সম্ভবত অন্য যে কোনো ধর্মের চেয়ে খোলামেলা আলাপ করা হইছে। যেমন ধরেন: মেয়েদের মাসিক, মেনোপজ, স্বপ্নদোষ, স্ত্রীকে আদর-সোহাগ মানে ফোর-প্লে আরকি, যৌনাঙ্গ- এগুলোর বর্ণনা তো পাওয়াই যায়। তাহলে দ্বীনি ভাই-বোনদের এতো সংকোচ কেন?
যৌনতা নিয়ে এই ট্যাবু এটা যে খ্রিস্টান বা হিন্দু ধর্মের লিগ্যাসি, সেটা কি আপনারা বোঝেন? আপনারাও কি মোক্ষ লাভের জন্য একটা যৌনতামুক্ত নিরামিষ ইসলামি সমাজ চাইতেছেন?
যৌন অবদমন সমাজের বহু ক্রাইমের জননী, এইটা মনে রাইখেন। যৌন হতাশা বা অবদমন থেকে মুক্তির উপায় খোঁজেন। ভাইবা দেখেন আপনার ধর্ম যৌনতার জন্য কতোখানি স্পেস দিতে রাজি আছে। যার সামর্থ্য আছে সে যে কোনো উপায়ে: ধর্মের নিজস্ব ব্যাখ্যা বা ইন্টারপ্রিটেশন হাজির করে হলেও সে তার যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণে উদ্যত হবে। আপনি তারে বাধা দিতে গিয়ে নতুন সমস্যার শর্ত তৈরি কইরেন না। নিজের প্রতিও খেয়াল করেন। সিদ্ধান্ত নেন, আপনি যৌন আকাঙ্ক্ষা দমন করে সাধু সন্ত হয়ে জিন্দেগি পার করবেন নাকি নিজের মনের বারান্দাটা আরেকটু বড় করবেন!

কোন মন্তব্য নেই