আয়না

Share:

a short love story

“তোর বাপক কয়ে দেস না কন্যাবেউলা, মুই আলাভোলা গিরস্তের ব্যাটা,মুই তো শালনা ধানের শীষদুবলা ঘাস, আবার কেউটা সাপও হওঁতুই তো কাঞ্চি পাছের ঘাসফুল, শাটি মাছের ভত্তা, চ্যাং মাছের ঝোল।তোর মায়ের সাঁতে ভাব,বাপ ক্যান খালি খিটমিট করে মোর সাঁত।”

এই বিজি, দেখ দেখ, আয়না ক্যাংকা নজ্জায় নাল হয়ে গেইচে। ওই চল যাবু নাকি পাতরঘাটা? একন তো তুলসিগঙ্গাত পানি নাই। চল নদীর ধনত যায়ে তুই আর মুই খালি বসে থাকমো….হি হি হি!

এইবার বিজিও শরম পায়। কয়, এই সবুজ উংক্যা করে কস না, দ্যাক মানুষ শোনোচে। তোর বাপ যদুল শোনে, তালে তোর কিন্তু খবর আচে!

এই বিজি কিন্তু সেই বিজি নয়, বইপুস্তকে যাক কয় বেজি। চ্যাংড়াটা ছোটকালততে কালো ধুদ্ধুরা, আর চিকনা। দৌড়াবাও পারে বাপুরে! অক ধরার মতন কেউ ইছাও নাই। ওই নাওটা অক দিছে অর দাদা। আসল নাও আজম। কিন্তু তার পরেততে আর আসল নাওটা ধরে কেউ ডাকে না। ওই বিজি নামেই সবাই চিনে। তুলে থোয়া এ্যাটা নামও আছে। সেটা অর বাপ-মায়েরও মনে আছে কি না সন্দে!

গান কোনা সবুজই বান্দিচে। আয়নাক বলে অর খুব ভালো নাগে। সবুজের বাপের অবস্তা তো ভালো। ওই চকোত এক দাগে ১০ বিগা ধানি জমি। আবার ডাঙাত দুই আড়াই বিগা ভিটা মাটিও আচে। অমাঘরে আবাদ কখনো বান-বন্যায় যায় না। ওই খালি কাতি মাসের কদিন ছাড়া ভাতের কষ্ট ককনো হয় না।

কিন্তুক আয়নার বাপের অবস্তা তো ভালো নয়। সোজা কতায় অঁই পাটের বেটি। সবুজের বাপ যদি খালি এই কতা জানে তালে পরে সবুজের হাড্ডিগুড্ডি ভাঙ্গে গুঁড়া গুঁড়া করে দিবে!

সবুজ চ্যাংড়াটা দেখতে-শুনতে কিন্তু ভালোই। আবার ছাত্রও ভালো। আর আয়না গরিবের বেটি হলেও উংক্যা সুন্দর চ্যাংড়ি ই এলাকাত নাই। ওরা দুই বুন। আয়না ছোট। ওই সবুজেঘরে বাড়ির পাশটানে অর বাপের এক বিগা জমি আচে। অটাই সম্বল। আমন ধান কাটার পর দুই বুন ওই জমিত বকরি বানবা আসে। সবুজের অবশ্য ভালোই হইচে। সকাল বিকাল বকরি আনতে যাতে আয়নার সাতে দ্যাকা হয়। বাপ-মায়ের ভয়ে অবশ্য কতা হয় না। ওই খালি চামা পকরের পাড়ের দিকে জঙ্গলের আড়াল হলে চান্স নেয়।

কিন্তুক আয়না কি সিটা বোজে? অই চ্যাংড়ি দেকোঁ কোনো কতাও কয় না। আবার চান্স পালেই সবুজ এতো বিরক্ত করে, তারপরও কেচু কয় না। বাড়িত যায়ে বিচারও দেয় না। আবার দেকোঁ দেকা হলে উ এলাকাততে সহজে যায়ও না।

বিজি সবুজক কয়, তুই জি অক পচন্দ করিস এটা কি অঁই জানে? বোজে? সবুজ কয়, ক্যাংকা করে কমু? অঁই তো কিছু কয় না।-কদ্দিন আর ইংক্যা করে অর পাশটানত লাগে থাকপু?-ভয় নাগে তো, আবার যদুল না কয়ে ফ্যালায়! বাইত যায়ে যদুল বিচার দেয়?

যাই হোক, বিকালবেলা খ্যালাটা কিন্তু হামাঘরে ভালোই জমে। চ্যাংড়া প্যাংরা বেটিছল-ব্যাটাছল একসাতে বদন, গোল্লাছুট, নুকানুকি খেলি। আমন ধানের ইয়া বড় বড় পালার ফাঁকত বেটিছল ব্যাটাছল একসাতে গাদাগাদি করে নুকে থাকা। আয়নাও থাকে। আলমেঘরে নতুন বাড়ির কাঁচা দেওয়ালের চিপার মদ্দে সবুজ সেদিন যে ক্যালেংকারিটা করে ফেলাল, মুই নিজেও শরম পাইচুঁ। আয়নাও দেকনু এ্যানা রাগই করলো। কিন্তুক সেই রাগত স্যাংকা এ্যাটা জোর দেকনু না!

শুকরবার কিন্তু আর খেলার চান্স নাই। বিটিভিত বাংলা ছবি দেকাই নাগবে। আলমগীর, শাবানা, জসিম, উবেল, উজিনা, দিতি- উজিনা আর দিতিক কিন্তুক ওই তিলের তংকেই বেশি ভালো নাগে। তা যাই হোক কান্দার অভিনয়টা কিন্তুক শাবানার মতোন কেউ পারে না। আর নায়কেঘরে মদ্দে ইলিয়াস কাঞ্চন। হায়রে কান্দন! কতোদিন যি কানতে কানতে হামাঘরেও চোকমুক ফুলে গেইচে!

গাঁওত তকনো কারেন আসেনি। গাঁওজুড়ে এ্যাটাই টিপি। নুরল ভাইয়ের ব্যাটা জয়নাল সেই টিপি চলায়। সেই বাজারততে ব্যাটারি চার্জ দিয়ে আনে। হামরা সবাই বাড়ির আগনাত জড়ো হয়ে ওই ব্যাটারি আসা পযন্ত অপেক্ষা করি। একছাও বেটিছলেরা আর আরেকছাও ব্যাটাছলেরা বসে। ছুটু আগনা, জাগা হওয়াই কঠিন! আয়নাও আসে ছবি দেকপা। সেদিন অবশ্য আর কেচু করার সুযোগ থাকে না। ছবি শ্যাষ হতে হতেই তো শুন্দা পার হয়ে যায়।

সেদিন এ্যানা আগেভাগেই খ্যালার জন্য সবুজ, বিজি, হামরা চলে আইচি। বেটিছলেরা কেউ তকনো আসেনি। বসে আচি টোঙ্গত। হটাৎ দম আটকে যাওয়া কাশের শব্দ। এই বুজি জিউটা বার হয়ে গেল!-কে রে বিজি-কে আর হবে, সইদালি বুড়া-শালা বুড়া তো মনে কয় আর বেশি দিন নাই-হয়, হয়!খায়ে না খায়ে অদের মদ্দে খাটতে খাটতে পোড়া খাটার মতো শরীল করিচে সইদালি। পঞ্চাশেই অবস্তা ক্যারাসিন! অবশ্য জাগা-জমি ভালোই করিচে। ম্যালা জমি কিনিচে। ছলেরা একন শ্যানা হইচে। বেটিঘরে বিয়া দিচে। ব্যাটারা খাটা শিকিচে। সইদালি তাই আর ত্যামন এ্যাটা কাজকাম করে না।কিন্তুক গিরস্তালি ছাড়েনি। নুঙ্গির ট্যাঁকত শয়ে শয়ে ট্যাকা নিয়ে ঘোরে। তাই বলে জীবনে কাকো জি দুপসা দিচে সে কতা কেউ শোনেনি।সইদালি এখন খালি আলাপাতা ওঁটের নিচে দিয়ে পাড়া ব্যাড়াবে আর চ্যাংড়িঘরে সাতে ঠাট্টা-মশকরা করবে।-এই সবুজ, আয়না-কোটে?সইদালি তার খাসলত মতো কয়- ওই ছুঁড়ি মোর সাতে নিকা বসপু? ডের বিগা জমি নেকাপড়া করে দিমু। রাজরানির মতোন থাকপু।-ধ্যাৎ বুড়াআয়না আগে গজরগজর করে। কিন্তুক তার মাও তাক ধমক দ্যায়।- বুড়া মানুষ এ্যানা ইয়ার্কি করে, তা কী হইচে? তাই বলে উংক্যা করা নাগবে?-ইংক্যা ত্যাজের চ্যাংড়িই তো মোর নাগবে!

-দ্যাক, শালা বুড়ার অদ্দেকটা কব্বরত ঢুকিচে, তারপরও খাসলত যায়নি। রাগে কটমট করে বুড়ারছাও চায়ে থাকে সবুজ।

ইংক্যা করেই দিন যায়। কেউ মুক ফুটে কেচু কয় না। এইছাও সবুজেরও ছটফটানি বাড়ে।-তোর স্কুলত কতো ভালো ভালো মেয়ে আচে, তুই ওই পাটের বেটির পাশটানত ইংক্যা করে নাগিচি ক্যা? অঁই তো ইশকুলতও যায় না। অর বাপের যে অবস্তা, ন্যাকাপড়া করারও তো চান্স নাই।- তুই বুজবো নারে বিজি! কার মন কাক টানে সিটা কি বলে কয়ে হয়? এই যে ছবিত দেখিশ না, এ্যাটা বড়লোকের ব্যাটার সাতে ক্যাংকা গরিবের বেটির পেম হয়। ক্যাংকা করে হয়! কবা পারবু?- নি তুই কর। মুই অতো বোজোঁ না বাপু।

সেদিন বিকালে হঠাৎ বিজিক বাড়িত থাকে ডাকে আনল সবুজ। সেই উত্তেজনা! কি ব্যান এ্যাটা পাইচে। -বুজলু বিজি, এবার কাম হবেই।-কী কাম, মোক তো কেচুই কলু না একনো।-এই দ্যাকছুটু এ্যাটা কাগজত বাগ-বকরি খ্যালার ঘরের মতো করে কি জানি আঁকিচে। একেকটা ঘরের মদ্দে কি জানি ন্যাকিচে।-শোন, এটাক কয় নকশে সোলাইমানি। এটা সেই তাবিজের কিতাবততে নেওয়া। -তুই এটা পালু কোটে?-নানা আইচে। নানা তো এটা দিয়েই কতো মানষের চিকিস্সা করে। নানাবাড়ির অটে কেচু হলেই সবাই আগে নানার কাচত আসে। কামও হয় তো দ্যাকোঁ।-তে তুই একন এটা কী করবু?-আয়নার নাম কয়ে বাঁশের আগালত তাবিজ করে বাঁনদে দিমু।-অ, সেই কতা। মুই তো শুনিচু এগলার তংকে হাতযশ নাগে।-আরে দেকিই না কী হয়!সেই মাকলা বাঁশ টানে নামাবার পর আগালত নিজে হাতে তাবিজ বানদে দিল সবুজ। তারপর ছাড়ে দিতেই সাঁই করে বাঁশটা আবার সোজা হয়ে গেল। এই করব্যা যায়ে দুজনেরই হাত পায়ে অনেক জাগা ছিঁড়ে খানিকটা অক্তও বার হলো। হোক, পেমের জন্য একনা সহ্য করাই নাগবে।

এখন তালে কী হবে? আয়না কি কাল সকালেই দৌড়ে আসে সবুজের বুকত ঝাঁপ দিবে? নাকি পাগলিনি হয়ে বাপ-মাওক কবে, সবুজক ছাড়া মুই কাকো বিয়া করমু না! নাকি আবার অন্য কোনো কেলেঙ্কারি ঘটে ফ্যালায়!

কী হয় না হয়, অপেক্ষা করা ছাড়া তো আর উপায় নাই। কিন্তুক সবুজের তো আর ত্বর সয় না! সপ্তা যায়, মাস যায়। শীতের পর গরম আলো। মনের আশা তো পূরণ হলো না। জষ্টি মাসের কাটফাটা অদের মদ্দে টইটই করে ঘুরে ঘুরে শরীলে ঘামাচি উটে গেচে আয়নার। আহা, এ্যাটা পাউডারের কট্যা যদি কিনে দেওয়া পারনু হনি! আর অক এতো অদের মদ্দে ঘোরা নাগবে ক্যা ক তো?-বকরি চরাবে কে?-ক্যা, অর বড় বুন, ওই শিনটের তো বুনটা কী করে?-তুই কি পাগলা হয়ে যাচিস না কিরে!-হমুই তো!

চারোছাও ভ্যাপসা গরমে মানুষ খালি হাঁসফাঁস করোচে। পাতারোত গরু বকরি বানদে থুবারও জো নাই। গরমেই মরে যাবে সব! শালা এই গরমের মদ্দে খ্যালধুলাও তো করা যায় না।-নাহ, এ বিজি, চলতো পাড়াততে এ্যানা ঘুরে আসি।- এ্যাটে এ্যানা বাতাস নাগোচে, নক্করে বসে থাক তো কেচুক্ষণ।-আরে চল, খালি যামো আর আসমো।-এই গরমের মদ্দে মুই যামু না। তোর বেশি মন টাটালে যা তো, এ্যাকলা এ্যাটা চক্কর দিয়ে আয়। মুই এ্যাত্তে নড়োচোঁ না।-এটা কোনো কতা? এতো গরম পড়া নাগবে?-আরে ধজ্জ ধর। দুয়েক দিনের মদ্দেই পানি হবে। -ঠিকই কইচি। চ্যাংটা গরমে তো পানি হয়।

এর মধ্যে পাড়াত কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল- অমুকের বেটির সাতে নাকি অমুকের ব্যাটার সম্পক্ক! আজকালকার চ্যাংড়ারা খুব পাকে গেইচে। এই বয়সে বলে পেম-পিরিত করা নাগবে। হামরা তো শোনোচি, সবুজের বাপ তো রাগে ফায়ার হয়ে আচে। অক মারেই ফ্যালাবে। খালি মায়ের কারণে এ্যাকনো কেচু কয়নি। অঁই ক্যাংকা ছুঁড়ি? পাটের বেটি হয়ে এতো বড় গিরস্তের ব্যাটার সাতে ফস্টিনস্টি করে। চ্যাংড়িই ভালো নয় তো। সারা দিন টইটই করে সারা পাড়া ব্যারাবে। উঠতি বয়সের ছুঁড়ি, মানুষের নজর পড়ে না? কাজেমের বাড়িত এ্যাটা হট্টানি হইছে। অঁইতো বেটিক কেচু কয়ও না।

বেটিক কবে কি! কাজেমের তো আরও আদর আল্লাদের শ্যাষ নাই। পারলে ওই ছুঁড়িক মাতাত তুলে থোয়। অঁই ভাবোচে বেটি তো সুন্দরী, বাপ গরিব হলেও ভালো ঘরোত বিয়া হবে। মোর তো মনে হয়, অঁই খুশিই হইচে। সবুজের গলাত যদি খালি ঝুলে দিবা পারে, আর কী নাগে!গাদার মতো কতা কস না তো। সবুজের বাপ এ্যাটা মানে নিবে, তোর মনে হয়? দ্যাক খালি কী হয়?

ঘুটঘুটা আমাবশ্যার আত। খেসারি কালাইয়ের ডাল আর আলুর ভত্তা দিয়ে গরম গরম ভাত খাবা বসিচে কাজেম চাচা। মেয়েটা আজ আর ভয়ত বাপের কাচত ভিড়োচে না। সাড়া গাঁও এ্যাকন ওই এ্যাকি কতা।

কাজেম চাচার ভাত খাওয়া পরাই শ্যাষ। তলে জড়ো হওয়া ডালটা পিয়া খাওয়ার জন্য থালটা কাত করে মুকত নিচে আর তকনই বারততে ডাক পললো- কাজেম চাচা আচেন নাকি বায়ে? -কে?- চাচা মুই, শরিফুলকাজেম চাচার বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে ওটে। শরিফুল তো চিয়ারম্যানের চ্যালা। অঁই এই আতত কী কয়? -কও বা, কী কবা আসিচ-চাচা, ওই উবেলেঘরে বাইত চিয়ারম্যান সায়েব আইচে। তোমাক এ্যানা যাবা কোল।-হটাৎ মোক চিয়ারম্যান ডাকলো ক্যা বায়ে?-যাও, গেলেই বুজমেন।

তাড়াতাড়ি হাতকোনা ধুয়ে লুঙ্গিত মুচেই শরিফুলের পাছে পাছে হাঁটা ধরলো কাজেম চাচা। দুয়ারত যায়ে ছোট করে এ্যাটা হোঁচট খালো। আগ আর ভয় নিয়ে আয়নার দিকে তাকাল চাচি। আয়না খালি মুকটা নামে নিল।

উবেলেঘরে বাইত আজ হ্যাচাক লাগাইচে। চারোছাও ফকফকা। বাড়ির দুয়ারত যাতেই দেকা গেল আগনাত অনেক মানুষ। চিয়ারত বসে আচে চিয়ারম্যান। তার আকটানেই বসা কে কে জানি। সবুজের বাপের মুকটা দেকেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উটলো কাজেম চাচার। পাও আর ওটে না। কোনোমতে শরীলটা টানে চিয়ারম্যানের আকটানে যায়ে খাড়াল কাজেম চাচা।-চিয়ারম্যান সায়েব হামাক ডাকিচিলিন?-হ, আমি তো ডাকিনি, ডাকিচে ওই যে হামার চাচা।(সবুজের বাপ)

বুজাই যাচে, সবুজের বাপ রাগে খালি ফোলোচে। একে তো গরম। তার ওপর রাগে তার পাঞ্জাবি ভিজে শরীলের সাতে নাগে গেইচে।-তোর বেটির এতো বড় সাওস, মোর ব্যাটার সাতে লাইন মারে। তুই কিসের বাপ রে, এ্যাটা বেটিক সামলাবা পারিস না?তামান শরীল ঠান্ডা হয়ে যাচে কাজেম চাচার। এইবার শরীল কাঁপা শুরু হইচে। কে একজন এ্যাটা টুল দিয়ে কোল, কাজেম ভাই বস। দুই হাত জোড় করে ধপাস করে টুলের ওপর বসলো কাজেম চাচা। -চেয়ারম্যান সায়েব কন, আপনেই কন।তাগাদা দেয় সবুজের বাপ।- আজকালকার ছলপলের কতা আর কী বলমু। এ্যারা তো ময়মুরব্বি মানে না। সম্পক্ক করে। একন তো এই চ্যাংড়া প্যাংড়াঘরে বিচার করতে করতেই আমার কাম সারা। আমাদের সময় তো এই বয়সে এগলার কিছুই বুজি নি। কী কন চাচা!পান চাবাতে চাবাতে কতা কয় চিয়ারম্যান। আর ট্যারে ট্যারে দ্যাকে উবেলের মায়ের নাল বেলাউজ।চিয়ারম্যানের কতা শ্যাষ হতেই কে একজন গরম হয়ে গলা উঁচা করে কবা শুরু করে- এই চ্যাংড়াঘরে কয় মুরগি বয়স হইচে? এ্যারা একনি পেম-পিরিতি করে। কাজ নাই কাম নাই, তামান দিন খ্যালা আর এলা অকাম করে বেড়ায়। এ্যাগলাক শাসন না করলে ঠিক হবে না।

তড়াক করে বেঞ্চের উপর উটে বসে সবুজের বাপ। -মোর ব্যাটা তো ন্যাকাপড়া করে। ইশকুলত এ্যাটা সুনাম আচে। আর অরটা? বেন্নার বেটি, ন্যাকা নাই পড়া নাই, খালি পাড়া ব্যাড়ানা। চিয়ারম্যান সায়েব, অর বেটিক আগে ঠিক করবা কও।-কাজেম ভাইচিয়ারম্যানের ডাক শুনেই চমকে উটে চায় কাজেম চাচা।-শোন, তোমার বেটিক তুমি সামলাও। হামি কিন্তুক কিচু কনো না। তুমি যদি তোমার বেটিক সামলাবা পারেন তালে ভালো। বুজিচেন তো, আমি কী কবা চাইচি?-হ, চিয়ারম্যান সায়েবচিক্কর পারে কে যানি কয়, কাজেম কী বুজিচে সিটা এ্যাকবার কয়ে যাক।সবুজের বাপ গর্জন দিয়ে কয়- অঁই আর কী কবে? মান সম্মান যা যাওয়ার তা তো মোরই গেল। অর আর মান সম্মান কী?

-কাজেম ভাই, চিয়ারম্যান তোমাক যাবা কয়। যাও বাইত যাও। পাত্তরের মতো ভারী শরীলটা কোনমতে টানে নিয়ে বাইত যায় কাজেম চাচা। চাচিক ডাক দেওয়ার আগেই খুলে গেল দেউড়ি। ক্যারাসিনের কুপিটা মুকের ছাও ধরে বুজার চেষ্টা করে ঘটনা কী? আয়নাক সামলে থুস- এই কয়েই সোজা ঘরত যায়ে কুঁকড়িমুকড়ি হয়ে শুতে থাকে কাজেম চাচা।অব্যাসের কারণে ফজরের আজানের সময়ই কাজেম চাচার নিন ভাঙ্গে যায়। গোয়ালততে গরু বকরি বার করে। গরুক খ্যাড় দেওয়া, গবোর ফ্যালা, হাগা-মুতা এসব করতেই বেলা উটে যায়। ওইদিকে চাচির ঘর আগনা ঝাড় দেওয়ার কামও শ্যাষ। আন্দাবাড়ির পস্তুতি চলোচে। বাপ বেটি বসে চারটা গরম ভাত খায়। চাচি আর খালো না। ঘাড়ত কুদাল নিয়ে বার হয়ে যায় চাচা। বুনের সাতে আয়নাও বকরি নিয়ে বার হবা যায়। চাচি চিক্কর দিয়ে কয়, কোটে যাস তুই?-পাতারত, বকরি বানবা-বেন্নার বেটি তোক বকরি চরাবা নাগবে না। তুই নটিগিরি করে খাস। হাতে গাবিন বকরির দড়ি ধরা আয়না মাতা ছাপো করে নক্করে খাড়া হয়ে থাকে। -বাপের দুপয়সার মুরাদ নাই, অঁই গেইচে বড়লোকের ব্যাটার সাতে ভাব করবা। তোর বাপক কমু, খোড়া কানা লুলা যেটাই পাক ধরে আনে বিয়া দিয়ে দিবা। মানষের এতো কতা ক্যান শুনমু মুই? আয়নার চোকের আকটানে, পায়ের নিচত থাকে মাটি সরে গেইচে। আয়নার মাতার ভিতরে ফাঁকা, কদুর ডাবরের মতোন। চোকততে দুফোঁটা পানি পড়ে বাতাসত মিলে গেল।-আজ থাকে তুই বারে যাবু না। এই বাড়ির ভিতরততেই তোক বিয়া দিয়ে মুই আপদ বিদায় করমু।বুনের হাতত বকরির দড়িটা দিয়ে ঘরত যায়ে শুতে থাকে আয়না। কাপড়ের তুলার বালুশটা ভিজে আরও চ্যাপ্টা হয়ে বিছনার সাতত নাগে যায়।

সপ্তাখানেক পর। বিজি ছুটে আসে সবুজের কাছে। সবুজ তকন ন্যাকাপড়াত মন দিচে। বুজা যায় দৌড়াতে দৌড়াতে আইচে বিজি।-এইছাও আয়, জরুলি আলাপ আচে-কিরে, কী হইচে?-আয়নার খবর জানিস?- আব্বা মোক তালে বাঁচে থুবে মনে করিচিস!-আয়না তো নাই-নাই মানে, কস কী, কী হইচে ময়নার?-কাল রাতত বাইততে পালাইচে-কে কোল তোক?- অর বাপ-মাও খুঁজে বেড়াচে-অ, যারে আজম, তুই বাইত যা।

সবুজের কাছততে আজম দৌড়ে যায় আয়নাঘরে বাইত। কাজেম চাচা বারন্দার খুঁটি ধরে বসে আছে, আর চাচি বকেই যাচে।-যাক, আপদ দূর হইচে। উংক্যা বেটি মোর না থাকলেই আরও ভালো। কী পাপ করিচুনু তাই আল্লা মোক ইংক্যা এ্যাটা বেটি দিল।এই বলেই হাউমাউ করে কানতে কানতে ফিট হয়ে গেল চাচি। কাজেম চাচা দৌড়ে আসে ধরলো। আজম কলততে পানি আনে মুখত ছিটে দিলে চাচির জ্ঞান ফিরলো। জ্ঞান ফিরার পরোততে চাচি আর কতা কয় না। ওই যে চাচির কতা বন্দ হলো, চাচি সব কাজকাম করে কিন্তু কারও সাতে আর কতা কয় না।

আয়না নিখোঁজ হওয়ার তিন মাস পার হয়ে গেল। চাচা-চাচির শোকও খানিক সয়ে গেচে। দুপরে চারটা ভাত খায়ে ঘাড়ত কুদালটা ফেলে পাতারত যাবা বার হইচে কাজেম চাচা। ঠিক ওই টাইমে আজম দৌড়ে আসে হাঁফাতে হাঁফাতে কয়- চাচা, আয়না মোবাইল করিচে।কাজেম চাচা ঘাড়ততে কুদাল ফেলে দিয়েই ধপাস করে মাটিত ন্যাটা পাড়ে বসে পড়ে। শরীলত যানি আর কোনো বল নাই। -কোটে বা, মোর আয়না কোটে?-আই য্যা চাচা মুই কল দিচুঁ, থামেন, রিং হচে। আই য্যা ধরিচে। হ্যাঁ, আয়না, আই য্যা তোর বাপ, কতা ক।বাচ্চা ছলের মতোন ছোঁ মারে মোবাইলটা নেয় কাজেম চাচা। জীবনে মোবাইলে কতা কয়নি। ধরে উল্টা করে। “হ্যালো, মা, আয়না”। আজম হাত দিয়ে মোবাইলটা ঠিক করে দ্যায়। ওইপারত থাকে কতা কয় আয়না। ফোঁপানির শব্দ পাওয়া যায়।-আব্বা, মুই আয়না। তুই ক্যাংকা আচি-ভালো মা। তুই কোটে, ক্যাংকা আচি-মুই ঢাকাত আব্বা। ভালোই আচোঁ। মোর তোঙ্কে তোমাঘরক আর চিন্তা করা নাগবে না।

কোন মন্তব্য নেই