![]() |
| শিক্ষক হৃদয় মণ্ডল ও স্বপন কুমার |
বাংলাদেশের বিদেশ নির্ভর রাজনীতির অন্যতম হাতিয়ার সংখ্যালঘু ইস্যু। এই ইস্যু নিয়ে এখানে নানা পক্ষ। অবশ্য কোনো পক্ষের অবস্থানেই ধারাবাহিকতা বা কনসিস্টেনসি নেই। যে পক্ষটি বাংলাদেশ আহমান কাল থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বলে মুখে ফেনা তোলেন, তারাই আবার সাম্প্রদায়িক সংঘাত ঘটলে এদেশের সংখ্যাগুরু মুসলমানদের ধর্মান্ধ, মৌলবাদী বলতে কসুর করেন না। আরেক পক্ষ ‘নব্বই পারসেন্ট মুসলমানে দেশ’
নিয়ে অহমিকায় অন্ধ হয়ে আছেন। আর ক্ষুদ্র একটি পক্ষ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের বাংলাদেশকে মূলত হিন্দু বিদ্বেষী বলেই প্রচার করেন।
তবে সর্বশেষ নড়াইলের ঘটনায় সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকায় নিয়ে ত্যক্তবিরক্ত অপেক্ষাকৃত আওয়ামী লীগে ভরসা রাখা পক্ষটি নতুন বয়ান হাজির করছেন। তারা মৌলবাদী ধর্মান্ধ শক্তির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক ধান্দা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। অবশ্য এর আগের সাম্প্রদায়িক সংঘাত/নির্যাতনের পেছনে এই রাজনৈতিক ধান্দার কথা একাধিক জনে বলে এলেও এই পক্ষটি এতোদিন সেটি মানতে চাননি। যদিও নিজেদের সংখ্যালঘুদের ত্রাতা বলে দাবি করলেও বারবার সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন বা হামলার ঘটনা ঘটার পরও সেসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার করার কোনো আগ্রহ আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি।
সংখ্যালঘু রাজনীতির ফায়দা যে সব সময় আওয়ামী লীগের ঘরে গেছে এর সপক্ষে কিন্তু যথেষ্ট প্রমাণাদি আছে। এরপরও বিশেষ করে বাম রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা এই ক্ষেত্রে কেন আওয়ামী লীগের ওপরই ভরসা করেন সেটি একটি রহস্য। অবশ্য এর পেছনে তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে- সেই আলাপ অন্য একদিন করা যাবে।
২০০১ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়কার ঘটনাগুলোকে কীভাবে সেনসেশনালাইজ করা হয়েছে তা সংখ্যালঘু নির্যাতনের এই তালিকা দেখলে সহজেই বুঝতে পারবেন: এই লিংকে দেখুন।
ওই সময় শাহরিয়ার কবিরদের গণতদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও এভাবেই তিলকে তাল করা হয়েছে। বিএনপি বিদ্বেষী সিপিবি নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আবুল বারকাতের বইয়ে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখলের চিত্রটাই দেখি।
‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বঞ্চনা: অর্পিত সম্পত্তির সাথে বসবাস’ বইয়ে আবুল বারকাত বলছেন, ‘এ দেশে শত্রু ও অর্পিত সম্পত্তি আইনে ৫০ লক্ষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের যে ২১ লক্ষ একর ভূ-সম্পত্তিসহ অন্যান্য সম্পদ গ্রাস করা হয়েছে তা গ্রাস করেছেন মাত্র ০.৪ শতাংশ মুসলমান (গ্রাসকারীরা সবাই যদি মুসলমান হন)- অর্থা ৯৯.৬ শতাংশ মুসলমান ভিন্ন ধর্মের মানুষের সম্পদ জোরদখলের সাথে সম্পৃক্ত নন-(অনেকেই এটা হিন্দু বনাম মুসলমান সমীকরণে রূপান্তরের অপপ্রয়াস চালান)।’
একই গ্রন্থে ড. আবুল বারকাত লিখেছেন, ‘অতীতে অর্পিত সম্পত্তি দখলের সময় সর্বোচ্চসংখ্যক ৩৭ শতাংশ সুবিধাভোগী মুসলিম লিগের সঙ্গে জড়িত ছিল। আর বর্তমানে (২০০৬) ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে ৪৫ শতাংশ, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ৩১ শতাংশ, জামায়াতের সঙ্গে ৮ শতাংশ ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে ৬ শতাংশ সুবিধাভোগী সংশ্লিষ্ট। এখানে উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে সুবিধাভোগীদের ৭২ শতাংশ সংশ্লিষ্ট ছিল। ওই সময়ে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। ১৯৯৫ সালে সুবিধাভোগীদের বেশির ভাগই দলবদল করে ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। আবার ১৯৯৭ সালে সুবিধাভোগীদের বেশির ভাগই ২০০৩ সালে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেয়।’ (পৃষ্ঠা ৯৪)
অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে প্রয়াত বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি হয়েছিল। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই সময় সিংহভাগ সংখ্যালঘুর সম্পত্তি ছিল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দখলে।
এবার ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা বলি: সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসনের সংসদ সদস্য, শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক শিল্প উপমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসিবুর রহমান স্বপন। তিনি অবশ্য ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর মারা গেছেন।
ছোটকালে আমার বাড়ির পাশের এক আদিবাসী দরিদ্র হিন্দু পরিবারকে উচ্ছেদ করতে দেখেছি। যিনি এই কাজটি করেছেন তিনি আমার আত্মীয় এবং আজীবন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন।
খুব সম্প্রতি দুই শিক্ষককে নিয়ে নড়াইল এবং টাঙ্গাইলের ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকায় অনেক বামপন্থী সেক্যুলারের ঘুম ভেঙেছে বলে মনে হচ্ছে। তারা এবার কোনো রাখঢাক না করে সরাসরিই সরকারকে দুষছেন। সেই সঙ্গে পূর্বের ঘটনায় সরকারের নির্লিপ্ত ভূমিকার স্মৃতিচারণও করছেন।
এর আগে নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত ২০১৬ সালের ১৩ মে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নির্যাতনের শিকার হন। সামনে দাঁড়িয়ে থেকে কান ধরে ওঠবস করান জাতীয় পার্টির তৎকালীন এমপি সেলিম ওসমান। নেপথ্যে ওসমান পরিবার সুতরাং ঘটনা কিন্তু বেশি দূর আর গড়ায়নি।
২০১২ সালে রামুর বৌদ্ধপল্লীতে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনার পর তদন্ত আর কেন এগোয়নি এটা তো সবার জানা। এসব ঘটনার পেছনে সব সময়ই স্থানীয় আওয়ামী লীগ যুবলীগের নেতাকর্মীদের নাম কেন আসে?
কিন্তু এরপরও সংখ্যালঘু প্রশ্নে সেক্যুলারদের অবস্থান এখনো সেভাবে স্পষ্ট বলে মনে হয় না। তাঁরা সংখ্যালঘুদের তাঁদের মতোই সেক্যুলার (বাঙালি হিন্দুত্ববাদী অর্থে) ভাবতে পছন্দ করছেন। আমরা মুন্সিগঞ্জে বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের ব্যাপারে তেমন একটা নিদর্শন পাই। ঘটনার দিন হৃদয় মণ্ডলকে পাঠানো হয়েছিল বাংলা দ্বিতীয়পত্রের ক্লাস নিতে। কিন্তু তিনি গিয়ে বিজ্ঞান পড়ানো শুরু করেন এবং অপ্রাসঙ্গিকভাবে বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের বিরোধের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। ধর্মের দাবিগুলো উড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখান। স্বাভাবিকভাবেই দশম শ্রেণির ছাত্রদের মধ্যে কেউ কেউ এটা নিয়ে তর্ক শুরু করে। হৃদয় মণ্ডল গণিত ও বিজ্ঞান পড়াতেন। বাসায় কয়েক ব্যাচে টিউশনি করতেন। টিউশনির জন্য তাঁর বাসায় আলাদা একটি কক্ষই রয়েছে। অথচ স্কুলের শিক্ষককের টিউশনি বা কোচিং নিষিদ্ধ। এরপরও বলা হচ্ছে উনি একজন সৎ এবং আদর্শবান শিক্ষক। মুক্তির পর ঢাকায় এসেও ধর্মের অন্তসারশূন্যতা এবং বিজ্ঞানের জয়গান গেয়ে গেছেন তিনি। এটা পায়ে পাড়া দিয়ে বিবাদ বাঁধানোর সামিল। মাধ্যমিক স্কুলে একজন অতি সাধারণ শিক্ষক বিজ্ঞানের কতোটা কি ছিঁড়েছেন সেইটা তাঁর কয়েকটা ইন্টারভিউ দেখলে সহজেই অনুমান করা যায়।
মজার বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে যেকটি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে তার প্রায় সবগুলোই কোনো ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে। আর যখনই ঘটনা জটিল এবং সহিংস রূপ নেয় তখনই বলা হয়, ওই সংখ্যালঘুর ফেসবুক আইডি হ্যাক করে তাকে ফাঁসানোর জন্য কোনো খারাপ মুসলমান এই কাজ করেছে! মানে এমনটা বলার চেষ্টা যে, সংখ্যালঘুরা (বিশেষ করে হিন্দু) কখনোই ইসলাম বা মুসলিম বিদ্বেষী হতে পারে না!
এরপর আসা যাক নড়াইলের ঘটনা। ঘটনার সূত্রপাত ভারতের নূপুর শর্মার পক্ষে এক হিন্দু ছাত্রের স্ট্যাটাস নিয়ে। এর প্রতিবাদ জানাতে কয়েকজন শিক্ষার্থী অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের কাছে গিয়েছিল। কিন্তু শিক্ষক উল্টো ছাত্রদের ধমক দিয়ে বের করে দিয়েছেন, এমনকি তিনিও তাঁর ওই হিন্দু ছাত্রকে সমর্থন জানিয়েছেন। এরপরই মূলত বিষয়টি কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে।
এতো সাম্প্রতিককালের দুটি ঘটনা। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি এবার। ২০০১ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান হামলা করেছে। আমি তখন সবে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করেছি। পত্রিকার আফগানিস্তান যুদ্ধে ছবিসহ খবর ছাপা হতো গুরুত্ব দিয়ে। এমন একটি খবরের ছবি ছিল, একটি জঙ্গিবিমান থেকে এক আফগান গ্রামে নির্বিচারে গুলি করা হচ্ছে। আমার পাশে আরও কয়েকজন সহপাঠী ছিল। তাদের মধ্যে আমাদের অত্যন্ত লাজুক ভদ্র এক হিন্দু আদিবাসী সহপাঠী বললো- ঠিকই আছে। মুসলমানদের সাইজ করতেছে আমেরিকা। আমি তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে ছিলাম। এই ছেলের মুখে, প্রিয় বন্ধুর মুখে এমন বিদ্বেষের কথা শুনবো কখনো কল্পনাও করিনি! সেদিনই বুঝেছি, সাম্প্রদায়িক হিংসা মানুষের মজ্জাগত। এইটাতে জল ঠাললে আরও সুপ্ত অবস্থা থেকে জাগে, আগুনের মতো আরো ছড়িয়ে যায়। এটা সত্য যে, ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুরা ভয়ংকরভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, তাদের প্রতিবেশী হিন্দুত্বাবাদী মুসলিম বিদ্বেষীদের হাতে। তাই বলে এটা সত্য নয় যে, সেখানে সব মুসলিম অসাম্প্রদায়িক।
এখন কথা হলো, মানবাধিকারের বিষয়গুলো তো কারো ব্যক্তিগত চয়েসের বিষয় নয়। দেশের একজন নাগরিক সে সাম্প্রদায়িক হোক আর মৌলবাদী হোক তার তো মৌলিক মানবাধিকার এনজয় করার অধিকার আছে। আর এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেহেতুর রাষ্ট্রের, সেহেতু বাই ডিফল্ট যে আধুনিক রাষ্ট্রের চরিত্র সেক্যুলার সে তো অবশ্যই তার সব নাগরিকের অধিকার সংরক্ষণ করবে, তাকে সব ধরনের সুরক্ষা দেবে। কিন্তু আমাদের সেক্যুলার বন্ধুরা তাদের ভাষায় সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদীদের রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ক্ষমতাসীনদের এতো দিন দায়মুক্তি দিয়ে গেলেন!
অ্যাকটিভিস্টদের প্রধান সমস্যাই হলো, তারা ওকালতির ক্ষেত্রে খুবই সিলেকটিভ। প্রথমত ব্যক্তিগত পছন্দ, দ্বিতীয়ত দৃশ্যমান অ্যাকটিভিজমের মাধ্যমে ফায়দা কামাইয়ের সুযোগ আছে বা রাজনৈতিক ফায়দা আছে শুধু এমন ইস্যুতেই তারা কথা বলেন। এ কারণে তারা পাহাড়ি উপজাতি বা হৃদয় মণ্ডলের মতো শ্রেণীর ব্যাপারে যতোটা সরব থাকেন, গরিব সাঁওতাল নিচু জাত সমতলের আদিবাসীদের ব্যাপারে ততোটাই উদাসীন। আর রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তো রীতিমতো বিদ্বেষ বিরাগের কথা তারা প্রকাশ্যেই বলেন। এই কারণেই একটা শ্রেণী রোহিঙ্গারা দলে দলে এসে শিবিরে আশ্রয় নেওয়ার পর অনেকে কনডোম, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সাপ্লাইয়ের জোর দাবি তুলছিলেন। এখন যখন মাঝে মধ্যে খুন খারাবি, চুরি, মাদক ব্যবসায় রোহিঙ্গাদের নাম আসছে, ওই অ্যাকটিভিস্টরাই বলছেন, এই কারণেই এদের মিয়ানমার সরকার বের করে দিয়েছে। এদের সাথে এমন আচরণই করা উচিত! এই হলো তাদের মানবাধিকার অ্যাকটিভিজমের নমুনা। যেন আমার করুণা পেতে হলে তোমাকে অবশ্যই আমার কল্পিত সাধুটি, দুর্বল, বিনয়ী, সৎ, মিতব্যয়ী, সেই সঙ্গে বাচ্চা পয়দার ক্ষেত্রে হিসাবী হতে হবে!
এই যদি মানবাধিকার চেতনার হাল, তখন দেশে সংখ্যালঘু রাজনীতি, শুধু রাজনীতির ইস্যু হয়েই থাকবে। আর সংখ্যালঘুদের মধ্যে যারা জাতে উঠতে পারবেন তারা এই অ্যাকটিভিস্টদের সভা-সেমিনারে নিজ নিজ গোত্রের প্রতিনিধি হিসেবে দাওয়াত পাবেন।

কোন মন্তব্য নেই