নচিকেতার জনপ্রিয় একটি গানের লাইন এমন- ভালোবাসা আসলেতো পিটুইটারির খেলা, আমরা বোকারা বলি প্রেম। বলা হয়ে থাকে, রোমান্টিক অনুভূতি আসলে রসায়ন ও মনোস্তত্ত্বের এক জটিল মিথষ্ক্রিয়া। ধরুন, হঠাৎ আপনি একেবারে উথালপাথাল প্রেমে পড়ে গেলেন। আর আপনার এক বেরসিক বন্ধু বললো, আরে, এসব ভালোবাসা টালোবাসা বলে কিছুই নাই। এসব অনুভূতি মূলত ফেরোমোন, ডোপামিন আর অক্সিটোসিনের একটা ককটেল। দেখবি কয়েক বছর পর সব উবে যাবে! প্রথম প্রেমে পড়া যে কাউকে এমন কথা বললে নিঃসন্দেহে হতচকিয়ে যাবে, হঠাৎ জীবনটাকে অর্থহীন বেকার মনে হবে। প্রশ্ন হলো, প্রেম ভালোবাসা কি আসলেই মস্তিষ্কে রাসায়নিকের খেলা?
আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে! এরকম আগপিছু না ভেবেই প্রেমে পড়ে মানুষ। কখনো কখনো প্রথম দেখাতেই পা পিছলে পড়ে! ফলে ভেবেচিন্তে দেখেশুনে প্রেম খুব কমই হয়। অতোটা সচেতন হলে প্রেমে পড়াও যায় না। এমনটাই বলেন কবিরা। এ কারণে ‘ভালোবাসা অন্ধ’ এমন কথা বলে মানুষ। ভালোবাসাকে যুক্তির সীমায় বাঁধা যায় না।
এ কারণে ইংরেজিতে বলে, Fall in Love! প্রেমে পতিত হওয়া বা প্রেম করাকে আসলে পতন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। হালের সেলিব্রিটি দার্শনিক স্লাভয় জিজেক এই পতনের দারুণ একটা বর্ণনা দিয়ে অনেক লেকচারে। তাঁর ভাষায় প্রমে পড়া মানেই, বন্ধু-বান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন এক স্বার্থপর এলিয়েনে পরিণত হওয়া।
রোমান্টিক প্রেম বলতে যা বুঝায় সেটির কোনো সীমা নেই, অপ্রতিরোধ্য, বিস্ফোরক! এ প্রেমে যখন কেউ পড়ে সে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। তবে এখানে রহস্যের ব্যাপার হলো, এ প্রেমে একটা সরলতা আছে- কেউ যখন এমন প্রেমে জড়িয়ে যায় তখন তার আচরণ ও পরিণতি অনেকখানি অনুমেয় এবং অবশ্যম্ভাবী। নানা যুগে ও স্থানে নানা সংস্কৃতিতে এ প্রেমের প্রকাশটা প্রায় একই রকম। আধুনিক বিজ্ঞানের আগে এ ধরনের আবেগ অনুভূতিকে মানুষ সাধারণ কিছু কার্যকারণের সঙ্গে সম্পর্কিত করার চেষ্টা করেছে। যেমন, কিউপিডের তীর, তান্ত্রিকের বাণ ইত্যাদি। এভাবে আরেক রহস্যময় প্রাকৃতিক শক্তির সঙ্গে প্রেমকে জুড়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা ছিল।
অবশ্য শুধু বিজ্ঞান দিয়ে প্রেম ভালোবাসাকে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা আজও কঠিন। সেক্স ফেরোমন নামক রাসায়নিকটি প্রজনন সক্ষমতার বার্তা বহন করে। এটিকে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গীকে আকর্ষণের প্রধান উপাদান বলে অনেকে মনে করেন। ধারণাটি বেশ আকর্ষণীয়। তবে ফেরোমন যখন পোকামাকড়ের প্রজননের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তখন মানুষের ক্ষেত্রে এর উল্লেখ্যযোগ্য অবদানের প্রমাণ আজ অবধি পাওয়া যায়নি।
এখন একটি রাসায়নিক যদি শরীরের বাইরে দূরে কোথাও সংকেত পাঠাতে পারে, তাহলে ভেতরে কেন পারে না? নিউরোপেপটাইড অক্সিটোসিন হরমোনকে অনেক সময় ভুলভাবে ভালোবাসার বন্ধনের জন্য দায়ী হরমোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এটি মূলত মাতৃদুগ্ধ ক্ষরণ ও জরায়ুর সঙ্কোচনে প্রধান ভূমিকা রাখে। এ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। বিরানভূমিতে বসবাসকারী ইঁদুরের মধ্যে এ হরমোনের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করা হয়। এ ইঁদুর প্রজাতির মধ্যে একগামিতা এবং প্রকাশ্যে আদর করার সংস্কৃতি রয়েছে।
অক্সিটোসিন হরমোন ক্ষরণে ব্যাঘাত ঘটালে দেখা যায় এ ইঁদুর আবেগ প্রকাশে সঙ্কুচিত হয়। বিপরীতপক্ষে অতিরিক্ত অক্সিটোসিন ক্ষরণ ঘটালে বহুগামী ইঁদুর প্রজাতির মধ্যে যৌন আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যায়। এরা তখন রীতিমতো যৌন অভিযানে নেমে পড়ে! তবে মানুষের ক্ষেত্রে এ হরমোনের প্রভাব এতোটা নাটকীয় নয়। বিদ্যমান সঙ্গীর সঙ্গে প্রেম বিনিময়ে কিছুটা তীব্রতা দেখা গেলেও নতুন সঙ্গী খোঁজার প্রতি তেমন একটা আগ্রহ দেখা যায় না। ফলে এ হরমোন মানুষের প্রেম ভালোবাসার জন্য দায়ী এমনটা বলা মুশকিল।
কিন্তু এটা ঠিক যে, আমরা সেরকম কোনো বস্তু বা বার্তা যদি খুঁজে পাই-ও, সেটি রাসায়নিক বা অন্য কোনো প্রকারে থাকতে পারে- তার জন্য কিন্তু একটি গ্রাহক দরকার। তাহলে মস্তিষ্কের মধ্যে সেই প্রেমের ডাকবাক্সটা কোথায়? আর কীভাবেই বা এ বার্তা বাহককে শনাক্ত করা যাবে, যেখানে এ সংকেত তৈরি করার মতো কোনো অণু জানা নেই?
রোমানন্টিক প্রেমে পড়া মানুষের মস্তিষ্কের মানচিত্র তৈরি করতে গিয়ে দেখা যায়, মস্তিষ্কের যে এলাকাটি পুরস্কার বা স্বীকৃতি চায় এবং একটি লক্ষ্যের অনুসন্ধানে থাকে সেই অংশটিই উজ্জ্বল দেখায়। ফলে ওই অংশটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠার মানে যে নির্দিষ্ট একটি উত্তেজনার কারণেই এমনটা ঘটছে এটা বলা যায় না। তাছাড়া রোমান্টিক প্রেমের কারণে ওই অংশের পরিবর্তন ও আচরণ মাতৃস্নেহ এমনকি প্রিয় ফুটবল দলের প্রতি ভালোবাসার প্রতিক্রিয়া থেকে আলাদা নয়। ফলে বলাই যায়, স্নায়ুবিজ্ঞান এই অন্ধ প্রেমের বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারছে না।
অন্যদিকে একটু চোখ ফেরানো যাক: বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা প্রেমকে খুবই সাধারণ যান্ত্রিক বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রাণীর প্রজনন সিদ্ধান্ত একেবারে সাধারণ বা অভিন্ন নয়। ফলে একটি মাত্র বা একই বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এটি ঘটে না। যেমন, লম্বা মানুষ সব দেশেই পছন্দনীয়। তার মানে কিন্তু এই নয় যে, লম্বা মানুষের প্রজনন সক্ষমতা বেশি। এমনটি হলে কিন্তু আজ আমরা সবাই লম্বা হয়ে যেতাম। আর এভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারটা জটিল হয়ে গেলেও এতোদিনে আমাদের স্নায়ুতন্ত্র এটি সম্ভব করে ফেলতো।
ব্যাখ্যার এ ব্যর্থতাই বলে দিচ্ছে রোমান্টিক আকর্ষণ অবশ্যই একটা জটিল ব্যাপার। কিন্তু এটি এ ব্যাখ্যা দিতে পারে না যে কেন এটি এতোটা প্রবৃত্তিগত এবং স্বতঃস্ফূর্ত। এটি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সুচিন্তিত একটা ভাব নিই- সেরকম নয়। শান্তভাবে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া কি ভালো নয়? কিন্তু প্রেমের ক্ষেত্রে এটি ঘটে না। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমাদের প্রবৃত্তিকে সামলিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন থেকে শান্তভাবে ভাবতে হয় এবং বুঝেশুনে স্বাধীনভাবে সেটি প্রয়োগ করতে হয়। এ সময় আশেপাশের মানুষের প্রতিক্রিয়াও মাথায় রাখতে হয়।
কিন্তু প্রেমে পড়ার সিদ্ধান্ত নিতে মানুষ অতোশত ভাবে না। এ সিদ্ধান্তের জন্য কোনো ভিত্তি লাগে না। একইভাবে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়া এবং সামষ্টিক যুক্তিবুদ্ধির বিবর্তনীয় ধারণাও এর ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে খুব দুর্বল।
এখানে প্রবৃত্তিকে সরলীকরণ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সুচিন্তার চেয়ে ছোট করে ভাবাটা একটা ভুল। কারণ এর অন্তর্নিহিত শক্তি মানুষের যৌক্তিক বিশ্লেষণের চাইতেও বিশুদ্ধ, সচেতনভাবে যা কিছু করি বা ভাবি তার চেয়েও বিস্তৃত ও গভীর ভূমিকা রাখে এই প্রবৃত্তি। এ সত্যটি আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। ধরুন একটি মুখের বিস্তারিত বর্ণনার চেয়ে আমরা চোখে দেখে বেশি ভালো করে চিনতে পারি।
প্রেমের স্নায়োবিক ক্রিয়াকলাপ যদি এতোটাই সরল হতো, তাহলে সবকিছু ঠিকঠাক রেখেই একটি ইনজেকশন দিয়েই প্রেমের তীব্রতা উঠানো নামানো যেত। কিন্তু শান্ত ও কঠোর নিয়ম মেনে চলা বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান এটি অসম্ভব করে তুলেছে। প্রেম এতোটা জটিল না হলে হয়তো মানুষও আজকের হোমো সেপিয়েন্স হয়ে উঠতে পারতো না!
এক কথায় বললে, প্রেম- আমাদের অন্য অনেক ভাবনা, আবেগ ও আচরণ- মস্তিষ্কের ভেতরে অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপ যেভাবে প্রক্রিয়াকরণ হয় সে মতোই পরস্পরের মধ্যে একটি জটিল আন্তঃক্রিয়া। তবে প্রেম শুধু মস্তিষ্কে রসায়নের খেলা এমনটা বলা আর ‘রোমিও ও জুলিয়েট’, ‘লাইনি ও মজনু’, ‘শিরি ও ফরহাদ’ ‘বেহুলা ও লখিন্দর’ এগুলো ‘শুধুই শব্দ’ এমনটা ভাবা একই কথা। এভাবে ভাবলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়। শিল্পের মতো ভালোবাসা বা প্রেম হলো শারীরবৃত্তীয় নানা ক্রিয়া ও মিথষ্ক্রিয়ার বাইরে আরো অন্য কিছু।

কোন মন্তব্য নেই