মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা বাতিল যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-বিরোধী নয়

Share:

job quota reform movement in Bangladesh

বৈষম্য বিলোপের উপায় হিসেবে কোটা ব্যবস্থা বিশ্বের অনেক দেশেই আছে, আবার অনেক দেশে বাতিলও করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের কোটা ব্যবস্থা স্পষ্টত বৈষম্য সৃষ্টির কারণ হয়ে উঠেছে। এইখানে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি উপাদান থাকায় বহুদিন এ নিয়ে সেভাবে কেউ মুখ খোলেনি। কিন্তু 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা'র রাজনীতিকরণ ও দলীয়করণ এক সময় বিশেষ করে তরুণ সমাজকে এই বৈষম্য নিয়ে কথা বলতে সাহস যুগিয়েছে।

বাংলাদেশের এই অনন্য কোটা ব্যবস্থা কিন্তু বেশ কয়েকবার পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গেছে। সেটি যৌক্তিকীকরণের চেষ্টা মাঝে হয়েছে এটাও যেমন ঠিক, আবার পরবর্তীতে কোটা সংস্কারে রাজনীতিও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

১৯৭২ সাল থেকেই কোটা চলে আসছে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন কর্পোরেশন ও দপ্তরে নিয়োগে প্রথম শ্রেণির চাকরিতে ২০ শতাংশ মেধা এবং বাকি ৮০ শতাংশ জেলা কোটা রাখা হয়। এই ৮০ শতাংশের মধ্য থেকেই ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা এবং ১০ শতাংশ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। 

এর চার বছর পর ১৯৭৬ সালে প্রথমবার পরিবর্তনের মাধ্যমে ৪০ শতাংশ মেধা, ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, ১০ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারী এবং বাকি ১০ শতাংশ জেলার ভিত্তিতে কোটা নির্ধারণ করা হয়।

এরপর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে কোটায় অন্তর্ভুক্ত করে ১৯৮৫ সালে কোটা পদ্ধতির সংশোধন এনে ১ম ও ২য় শ্রেণিতে মেধাভিত্তিক ৪৫ শতাংশ এবং জেলাভিত্তিক ৫৫ শতাংশ করা হয়। এই জেলাভিত্তিক কোটার মধ্য থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারীদের ১০ শতাংশ এবং উপজাতীয়দের জন্য ৫ শতাংশ কোটা রাখা হয়।

১৯৯০ সালে নন-গেজেটেড পদগুলোর নিয়োগে কোটা পদ্ধতিতে আংশিক পরিবর্তন আনা হলেও প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে অপরিবর্তিত থাকে।

সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় ১৯৯৭ সালে। ১৯৮৫ সালের সবকিছু অপরিবর্তিত রেখে কেবল ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় “উপযুক্ত মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থী পাওয়া না গেলে মুক্তিযোদ্ধা/শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যা”র জন্য বরাদ্দের আদেশ জারি হয়।

তবে ২০০২ সালের বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ কোটা বণ্টনে আগের পরিপত্রগুলো বাতিল করে নতুন পরিপত্রে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত ৩০% কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া না গেলে শূন্যপদগুলো (ক্যাডার ও নন-ক্যাডার) মেধাভিত্তিক তালিকায় শীর্ষে অবস্থানকারীদের দিয়ে পূরণ করা যাবে। 

অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩০ শতাংশে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধা তালিকা থেকে নিয়োগের সুযোগ ছিল। তার মানে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণের মতো প্রার্থী শুরু থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল না। এই হার যে অস্বাভাবিক এটি স্পষ্ট হলেও স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় এই কোটা কমানোর বিষয়ে কেউ কথা বলতেন না।

তবুও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এই নির্দেশনা বাতিল করে। সেই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য নির্ধারিত কোটা পূরণ না হলে পদ খালি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০১১ সালে আরেক পরিবর্তনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদেরও নির্ধারিত ৩০ শতাংশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সবশেষ ২০১২ সালে ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা যুক্ত হয়।

কোটায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের অন্তর্ভুক্ত করার যুক্তি হলো, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরবর্তী ২১ বছর স্বাধীনতা বিরোধীরা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় মুক্তিযোদ্ধা কোটার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। এই বঞ্চনার ক্ষতিপূরণ হিসেবেই সন্তান ও নাতি-নাতনিদের যুক্ত করা হয়েছে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড ও বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ উল্লেখিত সময় পর্যন্ত বঞ্চিতদের জন্য বিশেষ বিসিএসের দাবিও তুলেছে।

কোটা ব্যবস্থা পরিবর্তনের এই ধারাবাহিকতা থেকে স্পষ্ট, বিষয়টি কখনোই নির্বিবাদ থাকেনি। কিন্তু আন্দোলনটা এখন এসে এতোটা তীব্র আকার ধারণ করলো কেন?

এর সঙ্গে শাহবাগ আন্দোলন পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের বয়ান ও এর ভিত্তিতে রাজনীতির রূপ নির্মাণের একটা যোগসূত্র আছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার এই চেতনাকে সামগ্রিক অর্থে দেখতে ব্যর্থ হয়েছে। সংকীর্ণ দলীয় বৃত্তের ভেতরেই তার রাজনৈতিক এজেন্ডা সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। এর প্রধাণ কারও শাহবাগ আন্দোলন কেন্দ্রীক জাতীয় বিভক্তি। এরপর থেকেই মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি ও বিপক্ষ শক্তিকে আলাদা করার ফিল্টারে পরিণত হয়েছে শাহবাগ। শাহবাগ পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বয়ন তৈরির সোল এজেন্টে পরিণত হয়। 

শেষ পর্যন্ত সেটি আওয়ামী লীগের একক বয়ানে পর্যবসিত হয়। কারণ শাহবাগ অনেক আগেই তাদের দখলে চলে গিয়েছিল। আমরা পরবর্তীতে দেখেছি, এমনকি সিনেমা, শিল্প-সাহিত্যও এই আওয়ামী বয়ানের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলেই মার খেয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের পক্ষে 'অবিকল্প তত্ত্ব' থেকে এমনকি বাম বুদ্ধিজীবীরাও সরতে পারেননি। কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার লক্ষণগুলো স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা 'স্বাধীনতার চেতনা' রক্ষার স্বার্থে এবং মৌলবাদের জুজু দেখিয়ে সরকারকে নৈতিক সমর্থন দিয়ে গেছেন। উদাহরণ হিসেবে আমরা প্রয়াত হায়দার আকবর খান রনো এবং দিলীপ বড়ুয়ার দুটি সাক্ষাৎকারের উল্লেখ করতে পারি। তাঁরা সেখানে তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। দেশে গড়পড়তা বাম রাজনীতি এই পথেই হেঁটেছে।

বিগত এক যুগে আমরা দেখেছি, দেশ, রাজনীতি ও নীতি নিয়ে আওয়ামী লীগ বয়ানের বাইরে কথা বলতে গিয়ে অ্যাকটিভিজম করতে যাওয়া অত্যন্ত সম্মানীত মুক্তিযোদ্ধারাও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। আমরা প্রয়াত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর কথা স্মরণ করতে পারি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কর্তৃত্ববাদী সরকার মুক্তিযোদ্ধার অর্জনকে তুচ্ছ করেছে। 

বিগত ১৫ বছরে মানুষ দেখেছে, দুর্নীতি, অনিয়ম, অপরাজনীতি, অর্থ পাচার, দুর্বল নীতির কারণে ভেঙে পড়া অর্থনীতি, সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি নিত্যপণ্যের বাজার, নিষ্ঠুরভাবে বিরোধী মত ও রাজনীতি দমন, মিথ্যাচার, সর্বোপরী সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ঔদ্ধত্য। রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ, বাজার সমিতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মসজিদ কমিটি, ব্যবসায়িক সমিতি সবখানে দলীয় লোকজনের দাপট। পদে পদে সরকারের ভন্ডামি, মিথ্যাচার। আমাদের জিডিপি, মাথাপিছু আয়, রিজার্ভ, রপ্তানি আয় এমনকি গড় আয়ু পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমেও এসেছে। বৈদেশিক ঋণ নিয়েও লুকোছাপা আছে। তথ্য গোপণের প্রাণপণ চেষ্টা। একদিকে পুঁজি পাচারের সুযোগ করে দেওয়া, অন্যদিকে ঘাটতি পূরণে অনিয়ন্ত্রিত নোট ছাপানোর পাশাপাশি সরকারের চেয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কোনো লক্ষণ নেই। এখানে অর্থনীতির কোনো সূত্রই আর কাজে দেয় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেই ফেলেছে, বিশ্ববাজারে সব পণ্যের দাম কমলেও বাংলাদেশে কমার সম্ভাবনা নেই। বেসরকারি উদ্যোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ নেই। ফলে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে চাকরির বাজার। এদিকে খরচ বাড়ছে জীবনযাপনের। উপযুক্ত শিক্ষক ও অবকাঠামো প্রস্তুত না করেই বারবার সিলেবাস ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তন মূলত কোচিং-টিউশন ব্যবসার রমরমা করেছে। স্কুল-কলেজগুলোতে আর পড়াশোনা হয় না। ছেলে-মেয়েরা ক্লাস কামাই দিয়ে কোচিংয়ে যায়। ফলে পড়াশোনার খরচও এখন অনেক বেড়ে গেছে। ফলে সন্তানের প্রতি বাবা-মার প্রত্যাশা বেড়েছে।

বিরোধী মত ও রাজনীতি দমনের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত থেকে দেখেছি, কীভাবে দেশের বিচার বিভাগ নিপীড়ক সরকারের সহযোগী হয়ে ওঠে। প্রভাবশালীদের ছাড় দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সর্বোচ্চ আদালতও। ফলে মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও নেই।

এমন বৈষম্যপূর্ণ এবং অসহায় পরিস্থিতিতে একমাত্র সোনার হরিণ হয়ে উঠেছে সরকারি চাকরি। বিগত এক দশকে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান প্রয়োজন অনুপাতে বাড়েনি, কিছু ক্ষেত্রে বরং কমেছে। সেই সঙ্গে অনেক খাতে ছাঁটাইও বেড়েছে। এসব খাতে কর্মীদের চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। সর্বোপরী এই সরকার বিশেষ করে প্রথম শ্রেণীর চাকুরেদের সুযোগ-সুবিধা এবং ক্ষমতাচর্চার সুযোগ করে দিয়েছে, বেসরকারি খাত সেটি কখনোই ছুঁতে পারবে না। 

আর এমনকি ভোটের অধিকার বঞ্চিত জনগণ যখন নিজেকে একেবারে ক্ষমতাহীন ও অসহায় গোবেচারা হিসেবে আবিষ্কার করবে তখন দারোগা হওয়ায়ই তার জীবনের মনজিলে মকসুদ হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ কারণে বিসিএসে এখন পছন্দের শীর্ষে থাকে পুলিশ।

বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা ছেলে-মেয়েরা সেই সোনার হরিণ ধরতে গিয়ে দেখে, সেটি আসলে সংরক্ষিত বন। সেখানে তার প্রবেশ সীমিত। অনেক আগে থেকেই কোটা সংস্কারের দাবি উঠছিল। তবে এটি প্রথম আন্দোলনে রূপ নেয় ২০১৮ সালে। ওই সময়ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা। এখনকার একই কৌশল তখনো মুক্তিযোদ্ধা কোটাকে ইস্যু করেছিল সরকারপন্থীরা। তাদের তখনো 'রাজাকারের বাচ্চা' বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এদের প্রধান লক্ষ্য আসলে কোটা সংস্কার নয়, বরং মুক্তিযোদ্ধা কোটা! তখনো একই ভাবে ছাত্রলীগ ও ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনগুলো ছাত্রদের ওপর চড়াও হয়েছিল। পুলিশও গায়ে হাত তুলেছিল। বারবার রাজনৈতিক আন্দোলন তো বটেই অরাজনৈতিক আন্দোলনকেও প্রতিপক্ষ সাব্যস্ত করে কঠোর হাতে দমন করার অজুহাত হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দাঁড় করানো হচ্ছে। সরকার বিরোধিতাকেই রাষ্ট্রদ্রোহ বলা হচ্ছে।

এই প্রবণতার পেছনে আমাদের প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী যারা ন্যারেটিভ তৈরিতে ভূমিকা রাখেন এবং গণমাধ্যম অনেকাংশে দায়ী। নব্বইয়ের পর থেকেই বিশেষ করে আওয়ামী লীগ শাসনামলগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির আখ্যা দিয়ে শিক্ষার্থীকে নির্যাতন, হল থেকে বের করে দেওয়া এমনকি পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার মতো ঘটনা অহরহ ঘটে আসছে। গণমাধ্যম নির্লিপ্তভাবে সেসব প্রতিবেদন করে গেছে। একটা ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছে। এখন তো এর মধ্যে নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে। সরকারের সমালোচনা এমনকি ভারতের সমালোচনাকেও স্বাধীনতা বিরোধী চেতনা আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এবং এই কারণে কাউকে নির্যাতন করতে গিয়ে বিবেকের দ্বন্দ্বমুক্তির মোক্ষম পথ হিসেবে সেই শিবির আখ্যা দেওয়ার পথই বেছে নেওয়া হয়েছে। 

সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সেই ন্যারেটিভের ধার অবশ্য কমে গেছে। একই ভাবে ভোঁতা হয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারের মধ্যকার ঘৃণার প্রাচীর খসে পড়ছে। অতি রাজনীতিকরণ ও অপব্যবহারে এসব শব্দ আবেদন হারিয়ে নিরপেক্ষ অর্থ পরিগ্রহ করছে।

এই দায়টাও এই সরকারকেই নিতে হবে। কারণ দাবি মতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একমাত্র ঠিকাদার তারা। তারাই মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করতে গিয়ে অপমানিত করেছে। নগদ টাকার ভাতা ও সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর পর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করতে গিয়ে লজ্জাজনক অনিয়ম করেছে। এমনকি অমুক্তিযোদ্ধাও ঘুষ দিয়ে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ঘুষ দিতে না পেরে অনেকে তালিকায় নাম তুলতে পারেননি। অনেক মুক্তিযোদ্ধা বলেছেন, এই অপমানজনক যাচাই প্রক্রিয়ায় তাঁরা যেতে চান না। এই অপরাধগুলো করেছেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের নেতারাই। রাজাকারের তালিকা করতে গিয়েও মুক্তিযোদ্ধাও সেই তালিকায় উঠে এসেছে!

নিজেদের সুযোগ সুবিধার জন্য রাস্তায় নামলেও এই সনদধারী মুক্তিযোদ্ধাদের কখনো দেশের সমস্যা নিয়ে কেউ রাস্তায় নামতে দেখেননি। তাঁদের সন্তানদের নামে করা সংগঠনও তাই। বরং সরকারের বয়ান প্রচার ও সমর্থনে রাস্তায় নামতে দেখা যায়।

এভাবে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে সরকার ক্রমেই জনগণের কাছে আস্থা হারিয়েছে। অথনৈতিক মুক্তি, সুষ্ঠু নির্বাচন, বাকস্বাধীনতা এসব বিষয়ে বাংলাদেশের সূচক ক্রমেই নিম্নগামী। উন্নয়নের ফুলঝুরিও এখন দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। এসব কিছু ঘটার পরও শুধুই মুক্তিযুদ্ধকে একক দলীয় সম্পত্তি দাবি করে বাকি জনগণকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে দমন করার কৌশল মার খাওয়াটাই স্বাভাবিক।

আজকে যেই শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছেন, মার খাচ্ছেন, এদের অনেকেই কিন্তু ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও মার খেয়েছেন। তখন অনেকে স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে আন্দোলন থামানো হলেও কোনো দাবিদাওয়াই বাস্তবায়ন করা হয়নি। বরং নেতা-মন্ত্রীরা খোঁচা দিয়ে অপমান করে কথা বলেছেন। তাঁরা পুরস্কৃতও হয়েছেন পরবর্তীতে। যেমন: পরিবহন শ্রমিক নেতা সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান।

এবার কোটা সংস্কার আন্দোলনে নতুন সংযোজন বলা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ। ২০১৬ সালে এরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১৫% ট্যাক্সে নির্ধারণের প্রতিবাদ করেছিল। সেই প্রতিশ্রুতিও পরে রাখা হয়নি। 

একটি ছাত্রসংগঠনকে বারবার যে কোনো আন্দোলন দমনে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক আন্দোলনে তাদের প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে নামতে দেখা গেছে। এই সংগঠন ক্যাম্পাসগুলোতে ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করেছে। ক্যাম্পাস রাজনীতি মানেই হল দখল, সিট বাণিজ্য। বিগত এক দশকে এই চর্চা আরও সহিংস হয়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মতো যাদের গণরুমে থাকার অভিজ্ঞতা আছে তাঁরা জানেন এইটা কতো জঘন্য চর্চা! এক দশকে মেয়েদের হলগুলোতেও সাধারণ শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের অসংখ্য খবর গণমাধ্যমে এসেছে। এই যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা হল থেকে ছাত্রলীগের ছেলে-মেয়েদের মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে এটা শুধু গত কয়েক দিনের ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; এটি দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

এতোকিছুর পরও যেভাবে শিক্ষার্থীদের বারবার হাইকোর্ট দেখানো হচ্ছে তাতে আর ড্যামেজ কন্ট্রোল হবে বলে মনে হয় না। ছাত্রলীগ ব্যর্থ হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে পেটানো হয়েছে। তাদের পিটিয়ে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। হয়তো হাইকোর্ট থেকে সান্ত্বনামূলক আদেশই আসবে, যেহেতু প্রধানমন্ত্রী তেমনটাই বলেছেন, সেহেতু সেটা না হয়ে উপায় নেই! কিন্তু এই যে ক্ষত শিক্ষার্থীরা বয়ে বেড়াবেন সারা জীবন, এর মূল্য আওয়ামী লীগকে শুধতে হবে। এই রাজনৈতিক পরাজয়ের গ্লানি বহুদিন তাদের পোড়াবে!

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, আজকের পত্রিকা

কোন মন্তব্য নেই