‘চাটুকারিতা করলে মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়া হবে। টকশোতে চাটুকারদের ডাকবেন না, মিডিয়া চাটুকার হবেন না। একটা দেশ ডোবে কখন, যখন মিডিয়া সত্য কথা বলে না।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এমন বক্তব্যে অনেকে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন। অনেকে আবার আরেক কদম বাড়া! এর মধ্যে সাংবাদিকেরাও আছেন। তারা বলছেন, চাটুকারিতারও স্বাধীনতা থাকতে হবে! কোন গণমাধ্যম কোন নীতিতে চলবে সেটি সরকার ঠিক করে দিতে পারে না!
চমৎকার! রাতারাতি এদেশের শিক্ষিত সচেতন মানুষ পরম স্বাধীনতার স্বরূপ দেখে ফেলেছেন বলে মনে হচ্ছে। আপাত দৃষ্টিতে একটি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক দেশে সম্ভবত এমন স্বাধীনতাকে সহ্য করার মতো সহিষ্ণুতা থাকাটা জরুরি বলে মনে হয়।
আসলেই কি তাই? স্বাধীনতা মানে কী বোঝায়? স্বাধীনতা পেতে চাইলে দায়িত্ববোধটাও থাকা চাই- এমন ক্লিশে বয়ান দেওয়ার কোনো প্রবৃত্তি নেই। বরং স্বাধীনতাকে আরও একেবারে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সংকুচিত করে একটু কাঁটাছেঁড়া করে দেখার প্রয়াস আছে।
অনেকে হয়তো ভাবেন, স্বাধীনতা মানে একটা নির্ভার, নির্মল, নিরাপদ, নিশ্চিন্ত জীবন! যারা এমনটি ভাবেন তাঁদের বাস্তব জীবনবোধ নিয়ে সন্দেহ আছে। তাঁদের জন্য এমন জীবন একমাত্র পরলোকেই অপেক্ষা করে থাকতে পারে, ইহলোকে নয়!
এমন জীবনের আশায় অনেকে আবার বুদ্ধের নির্বাণ নিয়ে নিজস্ব বয়ান হাজির করেন। কিন্তু এই নির্বাণের নামে একটা নির্লিপ্ত জীবনের মধ্যে মুক্তি খোঁজা বড় স্বার্থপরতা। এই নির্লিপ্ততা আপনাকে শুধু অস্তিত্বহীন করে ফেলতে পারে। নিদেন পক্ষে উপহার হিসেবে পেতে পারেন অমোচনীয় অপরাধবোধ!
স্বাধীনতার নামে এই নিরাপদ নিশ্চিন্ত জীবনের লোভ মানুষকে আলস্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে। মস্তিষ্কের এই আলস্যই একদিন তৈরি করে কর্তৃত্ববাদের শর্ত। এটি ফ্যাসিজম, অথোরিটারিয়ান অথবা অটোক্রেসি- যে কোনো একটি বা যৌথ ব্যবস্থার ভিত্তি পাকাপোক্ত করতে পারে।
আপনি যদি শুধু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চান তাহলে ফ্যাসিজম আপনার সেই ব্যবস্থা করে দেবে। আপনাকে দাঁড় করিয়ে দেবে উন্নয়নের অতিকায় মন্যুমেন্টের সামনে, বুঁদ করে রাখবে ন্যাশনাল হিরোর অভ্রভেদি মূর্তির সামনে নিরবচ্ছিন্ন জিগিরের মাহফিলে। খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যে হা হুতাশ করবে কি; ডায়াবেটিস-উচ্চ রক্তচাপের ভয় দেখিয়ে রসনা সংযত করতে বলবে; গ্যাস-বিদ্যুতের উচ্চমূল্যের কারণে সন্তানের জন্মদিনের উপহার কেনার টাকাটি জমাতে পারেননি, তাতে কী? বৈশ্বকি সংকটের মধ্যে এই বিলাসিতা কেন? বরং লোডশেডিংয়ে অন্ধকার নগরে উৎপাদনের রেকর্ড উদযাপনের আতশবাজি উপভোগ করুন!
এর মধ্যে শ্রদ্ধেয় শুভ্র কেশধারী ব্যক্তিরা এসে ক্ষমতার পক্ষে ওকালতি করে আপনার শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে থাকে। শান্তি বিনষ্টকারী কবি বুদ্ধিজীবীরা গণশত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়। মঞ্চে থিয়েটারে ধুলা জমে, তরুণেরা মত্ত থাকে ভাড়া করে আনা শিল্পীর কনসার্টে। আপনার ভালোমন্দের ভার কাঁধে তুলে নেয় পট্টবস্ত্রধারী বামন। আপনি তখন সাতেপাঁচে না থাকা শান্তিপ্রিয় নিপাট ভদ্রলোক।
চাটুকারিতার স্বাধীনতা যে আদৌ স্বাধীনতা নয়, সেটি এতোক্ষণে বোঝার কথা। তাহলে স্বাধীনতা আসলে কেমন?
স্বাধীনতা সেটাই, যখন আপনার পছন্দ আরেকজনে ঠিক করে দেয় না। স্বাধীনতার আনন্দ লাভের আশায় এক নিদারুণ যন্ত্রণার পথ আপনাকেই বেছে নিতে হয়! এইটাকে কেন যন্ত্রণা বলছি সেটি বোঝার জন্যই এখন কুমিল্লার রসমালাইয়ের গল্পটা বলতে হবে।
আপনি যাকে যমের মতো ডরান এবং রুটি-রুজির জন্য যার ওপর নির্ভর করেন সেই ফ্যাসিস্ট একবাটি রসমালাই আপনার সামনে ছুড়ে দিয়ে বলল, এটাই কুমিল্লার আদি ও আসল মাতৃভাণ্ডারের রসমালাই। আপনি খেলেন এবং প্রশংসা করলেন। ফ্যাসিজমের আকাঙ্ক্ষা হলো, আপনি অবশ্যই স্বেচ্ছায়, খুশি মনে তার প্রশংসা করবেন! এই স্থলে এবার দালাল গণমাধ্যমকে কল্পনা করুন।
এবার ভিন্ন চিত্র ভাবুন। আপনি সংশয়বাদী, একগুঁয়ে, অকৃতজ্ঞ; তাই নিজেই আসল মাতৃভান্ডারের খোঁজে নেমে পড়লেন। শহরতলীর কোনো এক সংকীর্ণ গলিতে জীর্ণ এক মাতৃভান্ডারকে আদি ও আসল বলে বিশ্বাস করার মতো কারণ খুঁজে পেলেন। সেখানেই খেতে বসে দেখলেন প্যাকেটের গায়ে সতর্কবাণী, ইট ইওর ওন রিস্ক! এতোকিছু পর এই সতর্কবাণী দেখে সেই রসমালাই খাওয়া বা না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারার নাম হলো স্বাধীনতা!

কোন মন্তব্য নেই