পালিটিকসের পারসেপশন যখন সংবাদপত্রে

Share:

মুজিবনগর সরকার (প্রবাসী সরকার)

পলিটিকসে পারসেপশন খুবই মোক্ষম অস্ত্র। কিন্তু সেই অস্ত্রাগার যদি সংবাদপত্রের অফিসে গড়ে ওঠে তাহলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার! বাংলাদেশে এখন সেটাই হইতেছে। ৫ আগস্ট মাইনা নিতে না পারা উচ্ছিষ্টভোগী সাংবাদিকেরা এখন নিউজ করতেছে তাদের পারসেপশন থেকে। ফ্যাক্টের কোনো ধারই তারা ধারতেছে না। চট্টগ্রাম বন্দর, মিয়ানমারে করিডোর, মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা এগুলো হইলো সাম্প্রতিক সময়ের ইস্যু। সবচেয়ে আলোচিত এবং সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জিং ইস্যু ছিল এইগুলা। এমনকি এই নিয়ে রীতিমতো একটা রাজনৈতিক ঝড় বয়ে গেছে কয়েক দিন। 

রাজনীতিতে পারসেপশন খুবই পরিকল্পিতভাবে পাবলিক ওপিনিয়ন ম্যানিপুলেশনে ব্যবহার করা হয়। এই কাজগুলা রাজনীতিবিদেরা প্রকৃত ফ্যাক্ট এই পারসেপশনের বিপরীত জেনেও এই কাজটি করেন শুধু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য। 

এই চতুর রাজনীতিবিদেরা পাবলিক পারসেপশন ভালো বোঝেন। সাম্প্রতিক সময়ে সারা বিশ্বে ডানপন্থীদের উত্থানের পেছনে এই কৌশলই কাজে দিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো ডানপন্থী বলতে আমরা যা বুঝি এরা কেউই তেমন কিছু নয়। এদেরকে এই কারণেই বলা হইতেছে নিও-কনজারভেটিভ। এরা কিন্তু সেই অর্থে ধার্মিক নয়, এমনকি নাস্তিক, একাধিত নৈতিক স্খলন, নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় এরা জড়িত। কিন্তু এরপরও ধার্মিকেরা এদের ভোট দিচ্ছে। তারা বিশ্বাস করতেছে, এরাই ধর্ম রক্ষা করবে! ভারতের নরেন্দ্র মোদি, আমেরিকার ট্রাম্প, নেদারল্যান্ডসে কনজারভেটিভ পার্টি (অবশ্য সম্প্রতি জোট ভেঙে সরকার কলাপস করছে), জার্মানিতে করজারভেটিভদের উত্থান সেই সঙ্গে নিও-নাজিদেরও রমরমা দেখা যাচ্ছে, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, ইতালি এরকম আরও অনেক দেশ। এমনকি সর্বসাম্প্রতিক দক্ষিণ কোরিয়ার ইলেকশনেও কনজারভেটিভদের এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, বিনিয়োগ, অভিবাসী সমস্যার বাস্তবতা সম্পর্কে এরা যে ওয়াকিবহাল নয় এমন কিন্তু নয়। এই কারণেই কিন্তু ট্রাম্প অলরেডি ফেইল করতে শুরু করছে। 

তো এই চতুর পলিটিশিয়ানরা কী করে, এরা পাবলিকের আকাঙ্ক্ষার সাথে তাল মিলায়। প্রকৃত সত্য ও বাস্তবতা জেনেও তারা পাবলিককে মিথ্যা আশ্বাস দেয়।

এই হলো রাজনীতিতে পারসেপশনের ফায়দা।

কিন্তু সাংবাদিকতায়ও যদি এই ফরমুলা ঢুকে পড়ে, তাহলে যা ঘটতে পারে হাতের কাছে তার দৃষ্টান্ত হইতেছে বাংলাদেশ। 

এই যে তথ্যবিকৃতি, বিকৃত/ভুল অনুবাদ, প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন বাক্য দিয়ে নিউজ কার্ড, মন্তব্যমূলক শিরোনাম, ইত্যাদি সব সময় যে সচেতনভাবে সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য করা হইতেছে এমন কিন্তু নয়। এদের মধ্যে অনেকে আছে যারা সাংবাদিকতার নৈতিকতার ব্যাপারে বেশ সচেতন। আর কেউ আছে এগুলার কিছুই বোঝে না, কীভাবে বেশি ট্রাফিক আসবে এটাই তার একমাত্র উদ্দেশ্য।

ঠিক এই সুযোগেই এসব সাংবাদিকদের মাথায় ঢুকে পড়ে পারসেপশন বায়াস। পারসেপশন থেকেই কনফারমেশন বায়াসের ফাঁদে তারা পড়তেছে। 

আমার ধারণা সমকালের ঘটনাটা এই কনফারমেশন বায়াসের কারণেই ঘটেছে। শোনা যাচ্ছে, যে সাংবাদিকের হাত দিয়ে এইটা হইছে তিনি হাসিনা আমলের সুবিধাভোগী। 

এখন আবার তাদের অবস্থান ডিফেন্ড করে একখানা রিপোর্ট তারা ছেপেছে। সেখানে দেখানোর চেষ্টা করেছে যে,অধ্যাদেশের মধ্যেই বিভ্রান্তি ছিল। সেখানে বিএনপিপন্থীসহ কয়েকজন আইনজীবীর বক্তব্যও তারা ঠেসে দিয়েছে।

তার মানে হলো, তাদের ভাষায় অধ্যাদেশের অ্যামবিগিটি থেকে তারা সিদ্ধান্ত দিয়ে দিছে। মানে তারা রিপোর্টে বলেছে যে, সরকারের অধ্যাদেশের এই অ্যামবিগিটি এইটাই ইমপ্লাই করে যে, শেখ মুজিব এবং চার নেতার মুক্তিযোদ্ধা সনদ কেড়ে নেওয়া হইছে!

প্রথম কথা হলো, এইটা সাংবাদিকদের কাজ না যে, রিপোর্টে সে বলবে, এই বক্তব্য এইটা ইমপ্লাই করে। মানে সালাউদ্দিনের বক্তব্যের সাথে যেহেতু ভারতের বক্তব্য মিলে যাচ্ছে, সেহেতু সালাউদ্দিন র-এর এজেন্ট! এইটা কি কোনো সংবাদপত্র লিখতে পারে? এরা কি নতুন করে জার্নালিজমের এথিকস শেখাবে নাকি? আজকের যেই রিপোর্টটা গা বাঁচানোর জন্য করেছে, সেটাই তো ওদের প্রথমে করা উচিত ছিল যে এইখানে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।

দ্বিতীয় কথা হলো, শেখ মুজিব ও চার নেতার বিষয়ে অধ্যাদেশে কোনো অ্যামবিগিটি নেই। এইটা অ্যামবিগিউয়াস মনে হওয়ার কারণ ওই একটাই, ইউনূস সরকার সম্বন্ধে তার পারসেপশন। ইউনূস সরকারকে যারা সকাল বিকাল জংলি আর জামায়াতের সরকার বলতেছে যারা তাদের কাছে বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে আগ বাড়িয়ে এমন ধারণা করারই কথা। তারা এই সরকারের প্রত্যেকটি কথায়, পদে পদে তাদের পারসেপশনের কনফারমেশন পাইতেছে। ফলে মিডিয়াতে এই ধরনের কনফারমেশন বায়াসের ছড়াছড়ি চলতেছে।

কোন মন্তব্য নেই