ধারণা বা রাজনৈতিক বর্গ হিশাবে নৈতিক সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং গণসার্বভৌমত্ব ইত্যাদি বাংলাদেশে ক্ষমতার চরিত্র পর্যালোচনার জন্য জরুরি তিনটি বিষয়।
এই ধারণাগুলো স্পষ্ট না থাকলে বা রণনীতি বিশ্লেষণের ভাষা রপ্ত না করলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট বোঝা প্রায় অসম্ভব। বাস্তবে আজ যে দ্বন্দ্বগুলো আমরা দেখছি, সেগুলো ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি বা দল বনাম দলের দ্বন্দ্ব নয়; এগুলো এই তিন ধরনের সার্বভৌমত্বের পারস্পরিক সংঘর্ষ। এই তিনের বাইরে সংসদীয় সার্বভৌমত্বের তর্কও আছে। সেটা অন্যত্র আলোচনা করব।
নৈতিক সার্বভৌমত্ব বলতে বোঝায় এমন এক ক্ষমতার দাবি, যেখানে ধর্মীয় বা কোনো নৈতিক দাবি নিজেকে চূড়ান্ত ও প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এই নৈতিক সত্য ধর্মীয় হতে পারে, মতাদর্শগত হতে পারে, এমনকি ‘জাতীয় স্বার্থ’ বা ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা’র ভাষাতেও হাজির হতে পারে। নৈতিক সার্বভৌমত্বের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—এটি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থাপন করে। এখানে যুক্তি দাঁড়ায় এইভাবে: “আমরা যা করছি তা নৈতিকভাবে সঠিক, অতএব এটি বিচারযোগ্য নয়।” উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যখন কোনো গোষ্ঠি ঘোষণা করে যে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কাউকে হত্যা করা নৈতিক দায়িত্ব, তখন তারা আইনকে অগ্রাহ্য করে একটি নৈতিক সার্বভৌমত্ব কায়েম করে। এখানে প্রশ্ন আর থাকে না—কে হত্যা করল, কেন করল, আইনের চোখে তা অপরাধ কি না। প্রশ্নের জায়গা দখল করে নেয় নৈতিক ঘোষণা। এই ধরনের সার্বভৌমত্বই সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এটি কোনো জবাবদিহি মানে না। নৈতিক সার্বভৌমত্ব নিজেকে আল্লাহ বা ঈশ্বর, ইতিহাস বা আদর্শের প্রতিনিধি হিসেবে হাজির করে, ফলে মানুষের কোনো রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সেখানে অবশিষ্ট থাকে না।
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ভিন্ন জিনিস। এখানে ক্ষমতার উৎস হিসেবে হাজির হয় রাষ্ট্র নিজেই—তার আইন, তার প্রতিষ্ঠান, তার প্রশাসনিক শক্তি। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের যুক্তি হলো: “রাষ্ট্রই শেষ কথা।” আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটি খুব পরিচিত। জরুরি অবস্থা জারি করে নাগরিক অধিকার স্থগিত করা, নিরাপত্তার নামে বিচারবহির্ভূত গ্রেপ্তার বা গুম—এসবই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উদাহরণ। এখানে ধর্মীয় নৈতিকতা নয়, বরং ‘রাষ্ট্রীয় স্বার্থ’ বা ‘আইনশৃঙ্খলা’ নৈতিকতার জায়গা দখল করে। এ ক্ষেত্রে কার্ল স্মিটের ঘোষণা সকলেরই জানা। তিনি বলেছেন, সার্বভৌম সে-ই, যে ব্যতিক্রমের সিদ্ধান্ত নেয়—অর্থাৎ কখন আইন চলবে না, সেটা যে ঠিক করে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বে এই সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্র নিজেই। এই ধরনের সার্বভৌমত্ব নৈতিক সার্বভৌমত্বের মতোই বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ এখানেও জনগণের বিচারক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়। পার্থক্য শুধু এই যে, এখানে সহিংসতা ধর্মের নামে নয়, রাষ্ট্রের নামে বৈধতা পায়।
গণসার্বভৌমত্ব এই দুইয়ের সম্পূর্ণ বিপরীত ধারণা। গণসার্বভৌমত্ব মানে হলো—ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ, কোনো নৈতিক অভিভাবক নয়, কোনো রাষ্ট্রীয় যন্ত্রও নয়। এখানে আইন রাষ্ট্রের ইচ্ছা নয়, আবার নৈতিক ঘোষণার ফলও নয়; আইন হলো জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। জনগণ ভুল করতে পারে—এই স্বীকারোক্তিই গণসার্বভৌমত্বের ভিত্তি। কিন্তু সেই ভুল সংশোধনের অধিকারও জনগণের কাছেই থাকে। সেটা হতে পারে আন্দোলনের মাধ্যমে, মতপ্রকাশের মাধ্যমে, আইনের সংস্কারের মাধ্যমে কিম্বা নির্বাচনের মাধ্যমে, এমনকি অসম্ভব হলে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। জনগণ রাষ্ট্র ও নৈতিক দাবিদার—উভয়কেই প্রশ্ন করতে পারে। হান্নাহ আরেন্ডট (Hannah Arendt ) দেখিয়েছেন, রাজনীতি টিকে থাকে কেবল তখনই, যখন কোনো সত্য—নৈতিক বা আদর্শিক—নিজেকে জনগণের ওপরে সার্বভৌম বলে দাবি করতে পারে না। রাজনীতি মানেই বহুত্ব, মতভেদ, মতবিনিময়, বিতর্ক, সামষ্টিক অভিপ্রায় নির্ণয়ের প্রক্রিয়া।
এই পার্থক্যটি একটি সরল উদাহরণে বোঝা যায়। ধরা যাক, কোনো এলাকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠল। নৈতিক সার্বভৌমত্বের অবস্থানে বলা হবে—অভিযুক্তকে হত্যা করাই ন্যায্য, কারণ ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অবস্থানে বলা হতে পারে—রাষ্ট্রই ঠিক করবে কে দোষী, প্রয়োজনে বিচার ছাড়াই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কারণ আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি। কিন্তু গণসার্বভৌমত্বের অবস্থানে প্রশ্ন উঠবে—অভিযোগের সত্যতা কী, আইন কী বলে, অভিযুক্তের অধিকার কী, এবং জনগণ হিসেবে আমরা কী ধরনের বিচারব্যবস্থা চাই। এখানে কেউই প্রশ্নাতীত নয়—না ধর্মের নামে কথা বলা গোষ্ঠী, না রাষ্ট্র নিজে।
জুলাই গণভ্যুত্থানের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই। এটি মূলত নৈতিক সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব—এই দুই ধরনের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে জনগণের প্রত্যাবর্তন। মানুষ বলেছে, আমরা আর ধর্মের নামে খুন মেনে নেব না, আবার রাষ্ট্রের নামে দমনও নিঃশর্তভাবে মেনে নেব না। আমরা ক্ষমতার উৎস হতে চাই। এই দাবি টিকে থাকবে কেবল তখনই, যখন নৈতিক সার্বভৌমত্বকে “ধর্মের ঐক্য”র নামে এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে “স্থিতিশীলতা”র নামে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের ওপরে বসতে দেওয়া হবে না।
সংক্ষেপে বললে, নৈতিক সার্বভৌমত্ব মানুষকে নৈতিক আদেশের অধীন করে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব মানুষকে রাষ্ট্রযন্ত্রের অধীন করে, আর গণসার্বভৌমত্ব মানুষকে রাজনৈতিকভাবে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। প্রথমটি সহিংসতাকে পবিত্র করে, দ্বিতীয়টি সহিংসতাকে আইনি করে, তৃতীয়টি সহিংসতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আজ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে—আমরা কোনটির পক্ষে দাঁড়াই তার ওপর।
লেখক: কবি ও দার্শনিক ফরহাদ মজহার

কোন মন্তব্য নেই